নির্বাচিত কবিতাগুচ্ছ

হেলেনা আমার 
অনন্য কাওছার 

বোবা পাখিদের গান শেখাবে বলে তুমি নিজেই ভুলে
যাচ্ছ গীতিকবিতা, ত্রিতাল গাম্ভীর্য, গানের লিরিক। 
প্রমিত উচ্চারণ করতে যেয়ে ভুলে যাচ্ছ সহজ বাক্যের
গঠনরীতি, বোবা প্রাণীদের মতো কেবলই নাড়াচ্ছ
ঠোঁট। 
গত বর্ষাকাল থেকে আমাকেও শেখাচ্ছ তুমি 
গীতিবাদ্য, গীতিকবিতার পরিচিত লাইন।
হেলেনা আমার, তুমি নিজেই জান না 
তোমার কণ্ঠস্বরে বেজে ওঠে পৃথিবীর আদিম সংগীত
তোমার অমিয়-ঠোঁটে যেসব বাক্য উচ্চারিত হয় 
তারচেয়ে কি আর হতে পারে এমন শ্রুতিমধুর?

যেই আমি তোমার মুখোমুখি হলে ভুলে যাই 
বাংলাদেশের আয়তন, 
রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রনীতির মধ্যে পার্থক্য। 
তাকে শেখাচ্ছ তুমি দুর্বোধ্য কবিতার লাইন;
সংবিধানের ১৭ নাম্বার অনুচ্ছেদ। 
হেলেনা আমার, 
তুমিই যে আমার একমাত্র আদর্শ সংবিধান 
পৃথিবীর ইতিহাসে সর্ববৃহৎ মহাকাব্য। 

গত শীতকাল থেকে আমাকে শেখাচ্ছ তুমি 
নীতিমালা, প্রাচীনকালের চর্যাগীতি;
কিন্ডারগার্টেনের শিশুদের মতো হাতেকলমে
আমাকে শেখাচ্ছ তুমি বর্ণমালা, ধ্বনিতত্ত্ব; 
বাংলা প্রমিত উচ্চারণ 
অথচ আমি উচ্চারণ করি: হেলেনা আমার, হেলেনা আমার। 

জনসচেতনতা বাড়াতে গিয়ে তুমি নিজেই 
গভীর রাতে বাড়ি ফিরছ, সিগারেট খাচ্ছ, 
তুমি নিজেই জান না আমি যে তোমার নেশায় 
মাতাল হচ্ছি, হুইস্কি খাচ্ছি, তলিয়ে যাচ্ছি
ডিপ্রেশনের নিতল আঁধারে। 
হেলেনা আমার, 
এরচেয়ে কি আর হতে পারে এমন বিষাদনীল?
এরচেয়ে কি আর হতে পারে এমন বেদনার? 

তোমার অবর্তমানে যেদিকেই পা ফেলি
অনন্য কাওছার  

যে দিকেই পা ফেলি পতনের মর্মর ধ্বনি,
বেজে ওঠে ইসরাফিলের তেজীয়ান শিঙা, সঘন আঁধার বেয়ে মুখোমুখি দাঁড়ায় হন্তারক- আমার নিশঙ্ক (অধঃপাত) 
আসন চেয়ে বসে আমারই হৃদিপদ্ম; আমার অবাধ্য পঙ্কজিনী। 
তোমার দিকে হাত বাড়ালেই দশটা আঙুল 
সাইবেরিয়ার মতো হিমশৈল বরফখণ্ডে 
পর্যবসিত এবং গোলাপের মতো 
তোমার কোমল ঠোঁটে-ঠোঁট হাতে-হাত বাড়িয়ে দিলেই 
ঠোঁটের কোটরে জমে ওঠে একখণ্ড বর্বর পাথর 
দুবাহু বিধ্বস্ত ইস্টিমারের ডুবন্ত ভবিষ্যৎ। 
যে দিকেই পা ফেলি ভূমিকম্পের ভূর্লোক কাঁপন 
পায়ের তলায় পাঁচটি বুলেটের অগ্নিগোলক 
কুমিরের নিয়মিত মন্থর যাতায়াত
ইঁদুর ও গর্তের পূর্বাভাস। যেদিকে তাকাই 
বারুদের নগ্ন মিছিল, কারাগার থেকে কারাগার,
ডিজিটাল হাসপাতালে সুস্থ মানুষের নেংটা উল্লাস
জাতীয়তাবাদ- স্বাধীনতা আন্দোলনের ফাঁকা গুলি 
পদাতিক বাহিনী, আবারও ১৯৭১-৭২।

যে দিকেই আঙুল ফেলি আপাদমস্তক 
বিষিয়ে নিথর-কাতর হয় অনিশ্চিত জীবন 

যে দিকেই পা ফেলি ডিনামাইটের ক্রমাগত উত্থান 
সুচের অগ্রভাগে আমার রক্তাপ্লুত শার্ট। শজারুকাঁটা 
সুতীক্ষ্ণ তীর ফলকের মতো গেঁথে আছে গ্রীবা  
স্বাপ্নিক মর্ত্যলোকে পুলিশের অনবরত হুইসেল।
তোমার অবর্তমানে যেদিকেই পা ফেলি 
পায়ের তলায় ভিসুভিয়াস, 
পাললিক নদীর মতো হাবিয়া দোজখ 
জীবিত শরীরের ওপর বারংবার অন্তেষ্টিক্রিয়া। 
তোমাকে ডাকলে যাত্রাপথেই লাশবাহী খাট
ট্রাকের সঙ্গে অটোরিকশার তুখোড় ধাক্কা  
মাসের পর মাস একযোগে লাশের মিছিল।

রমণীর পদতলে প্রেমের রোদন
অনন্য কাওছার 

তোমার ভালোবাসা পাইনি বলে আমাকে প্রত্যাখ্যান
করেছে যুদ্ধ ফেরত বিপর্যস্ত এরোপ্লেন, উত্তাল
জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে যেতে দেখেও উদ্ধার করেনি
কোনো চলমান যাত্রীবাহী সামুদ্রিক জাহাজ।  

নৌকোগুলোও নদীপথ ভুলে—
নিষিদ্ধ গন্তব্যে
আমাকে নির্বিঘ্নে পৌঁছে দেয়। কুমিরের রাজত্বে
বরাবরই আমি অচিন-নগরীর বার্তাবাহক
নরখাদকের প্রাচীন গুহার পাদদেশে
মাটিরফলকে একমাত্র পলাতক শিকার হিসেবে
আমি বিশেষভাবে চিহ্নিত।

সীমান্তবর্তী এলাকার চোরাচালানের সমস্ত অপরাধ
আমার নামে লিপিবদ্ধ হয় বলে মোটেও দুঃখিত নই।
তোমার ভালোবাসা পাইনি বলে আমাকে নির্বিকার
হাওয়াশূন্য জনপদ, সেন্ট হেলেনা নির্বাসন এবং 
সিসিফাসের অভিশাপ নিয়ে চলতে হয় অহর্নিশ
রূপসী, তোমার অজানা এ-থিসিস। 
 
তোমার ভালোবাসা পাইনি বলে আমাকে প্রত্যাখ্যান 
করেছে মাউন্ট এভারেস্টের সর্বোচ্চ চূড়া, রাজপথ 
হাইকোর্ট, এমনকি মাননীয় বিচারপতি;
শুধু তোমার ভালোবাসা পাইনি বলে আমার থেকে 
মুখ ফিরিয়ে নিলেন নোবেলজয়ী ফরাসি কবি।

হেলেনার জন্য দ্বিতীয় কবিতা 
অনন্য কাওছার 

পৃথিবীতে কি এমন মৌল উপমা আছে 
যা দিয়ে করা যায় তোমার স্তুতি, 
গলে কণ্ঠহারভেবে পরানো যায় শঙ্খমালা,
তোমার মতো কি এমন হীরকখন্ড আছে 
যা পেলে বহির্জগতও মনেহয় হাতের মুঠোয়;
লকেটের মতো রাখা যায় হৃদয়ের মাঝ।
আমি দার্শনিকের মতো জানি,
তোমার নিখুঁত সংলাপ লিপিবদ্ধ করতে যেয়ে 
তোমারই দারস্থ রাশিয়ান পাস্তের্নাক
নাট্যকার মায়াকোভস্কি।

আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কবিতায়: 
গীতবিতানে কি আছে এমন সুবর্ণা 
যা তোমার দুঠোঁটের ফাঁকে ধ্বনিত হবার চেয়েও 
অধিকতর মোহঘোর, চুম্বকীয় আকর্ষণ। 
সুন্দরী হেলেনা,
পৃথিবীতে তোমার মতো কি আছে এমন ইন্দ্রজালিক। 
তোমার সতন্ত্র শব্দালংকারের মতো 
কি আছে এমন নিখুঁত, নিটোল 
যা দিয়ে তাবিজের মতো ভেস্তে দেওয়া যায় জাদুমন্ত্র;
চোখবুঁজে প্রার্থনা করা যায় অনন্তকাল। 

তোমার মতো এমনই এক অলৌকিক সৌন্দর্য ছাড়া 
নিখিলে কি আছে এমন যথাযোগ্য উপাদান 
যা ভেবে অনায়সে লেখা যায় দীর্ঘ কবিতা,
এবং থ্রিলার সিরিজের উপাখ্যান, 
তোমার মতো কি এমন রোমাঞ্চকর বস্তু আছে 
যা দেখে আঁকা যায় মোনালিসার চিত্রপট 
ক্রমান্বয়ে বনলতা সেন।
তোমার ঠোঁটের মতো কি আছে এমন বরফশীত;
যা দিয়ে মেটাতে পারে তপ্ত বুকের অনির্বাণ অনল,
ফিলিস্তিনি শিশুদের বুকের প্রগাঢ় হাহাকার।

বলো, পৃথিবীতে কি আছে এমন জৌলুশ 
কি আছে এমন দীপ্তনীল,
তোমার মতো 
এমন স্বর্গীয় দিঘি-সরোবরের সান্নিধ্য পেলে আর
কোনো প্রেমিকের বুক থাকবে না তৃষ্ণার্ত, 
অনুর্বর, জলহীন। 
আমি গণিকার অবৈধ সঙ্গমের মতো জানি 
তোমার সৌন্দর্যের আরাধনা করতে যেয়ে 
তোমারই নিকটস্থ কালের নার্সিসাস,
জলপরী। 

সুরসুন্দরী, রাজকুমারী হেলেনা
ভুবনে তোমার মতো কি আছে এমন অলৌকিক 
আর কি আছে এমন সুসজ্জিত হেলেনিক ফুল,
আমি জন্মান্ধ প্রেমিকের মতো জানি
তোমার শীতোষ্ণ হৃদয় দখল করতে যেয়ে 
তোমারই দারস্থ মার্কিনী যুবকের দল;
দূতাবাসে একজন বাংলাদেশি আহত কবি।

সিটবেল্ট 
অনন্য কাওছার 

আমি চিরকাল ডুবে যাওয়া জাহাজের কামরায় 
ভীতু যাত্রীর কোনো এক, যে কিনা সমুদ্রের তলদেশে 
টাইটানিকের মৃত ইঁদুরের মতো স্থিতিশীল, 
অথবা আমি সেই অভাগা পাইলট যে কিনা 
বিধ্বস্ত প্লেনের সিটবেল্টে 
আটকা পড়ে আছি মধ্যম আকাশ;
বাতাসের কাছে হেরে যাওয়া আমি সেই কলমিলতা। 
আমি অনিচ্ছায় বিরোধী দলের 
খাবার টেবিলের সবিশেষ অতিথি 
আমি বরাবর বিপক্ষের উকিলের কাছে 
রেখে আসি সমস্ত অ্যাভিডেন্স, 
শিকারী পাখির ঠোঁটে জেনেশুনে রাখি ঠোঁট।

নারী প্রেমের নির্বাচিত কবিতা
অনন্য কাওছার 

তোমাকে বুঝে উঠতে আমার অর্ধেক জীবন 
কেটে যায় ভাবলেশহীন, তোমার দিকে তাকিয়ে 
চোখের পলকে পেরোই এককোটি বছরের পথ;
দুজনের দ্বন্দ্বের ভেতর নির্মাণ করি সেতুবন্ধন 
নারী, তোমাকে বুঝে উঠতে পারিনি আমি। 

তোমাকে বুঝে উঠতে আমার যৌবনের উপর 
নেমে আসে বার্ধক্য; বেড়ে যায় হাতের কাঁপন
হুমায়ুনচত্বরে চলন্ত বাস দেখলেই মনেহয় 
আমার দিকে এগোচ্ছে গতিশীল 
আন্তঃনগর ট্রেন। 
তোমাকে বুঝে উঠতে আমার অর্ধেক কবিতা 
অলিখিত থেকে যায় পাখির রুপালি ডানায়;
হারিয়ে ফেলি অজস্র কবিতার লাইন 
একে একে ফুরিয়ে আসে জীবন, যৌবন- নদী 
নারী, তোমাকে বুঝে উঠতে পারিনি আমি। 

তোমাকে বুঝে উঠতে আমার সমগ্র জীবন 
কেটে যায় উদ্দেশ্যবিহীন, তোমাকে ভেবেই
জীবনের শেষ অধ্যায় ঝুলে থাকে সুইমিংপুল;
বাংলা অভিধান, পাঠ্যপুস্তক পুরোপুরি 
পুরোদস্তুর মুখস্থ করে ফেলি তবুও 
নারী, তোমাকে বুঝে উঠতে পারিনি আমি। 
তোমাকে বুঝে উঠতে কোনো প্রচেষ্টা আর
অবশিষ্ট নেই, 
আধুনিক পদ্ধতিও বাকি নেই কোনো। 
তোমার সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে আমার জীবনের 
সবচেয়ে বিখ্যাত রচনাবলি লেখা হয়ে যায় অনিমেষ;
গতশতকের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রেমের রীতিনীতি 
আবারও উঁকি দেয় প্রেমিকের ফটকদরজায় 
নারী, তবুও তোমাকে বুঝে উঠতে পারিনি আমি। 

কেউ কি পেয়েছিল সমুদ্রের জলে
তোমার চোখের অনুসন্ধান? 
কেউ কি পেরেছিল তোমার হৃদয়ে 
বিরচিতে অন্তর্লীন গান?
নারী, 
  নারী,
তোমাকে বুঝে উঠতে পারিনি আমি।

মাধবীলতার নিরাপত্তাব্যবস্থা 
অনন্য কাওছার 

কেবল তোমার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে 
পরাশক্তি নেতাদের বিরুদ্ধে বসাবো গোপন বৈঠক;
কেড়ে নেব জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতা। 
আবারও তোমার দিকে বাড়াব হাতের গোলাপ 
বাগানের সবচেয়ে কমবয়সী রঞ্জনী ফুল।
মাধবীলতা,
তোমার মনোভীতি এড়াতে বেছে নেব নির্বাসন
সীতা-রামের অশোকবন এবং রাক্ষসবিহীন লঙ্কারাজ্য।
তোমার নামে বানাবো নক্ষত্রখচিত মাধবীমহল;
নন্দিত জলসাঘর। 

কেবল তোমার দুশ্চিন্তা সরাতে 
আবহাওয়া অফিসের 
যেকোনো সংবাদ পাল্টে যাবে 
কথা দিচ্ছি। 
তোমার ইচ্ছায় 
বদলে যাবে মিডিয়া 
গণমাধ্যম এবং 
টেলিভিশনের বিচ্ছেদপন্থী নিউজ। 

সংবাদপত্রের পাতায় পাতায় 
প্রতিটা শব্দে শব্দে ব্যবহৃত হবে 'সু'-উপসর্গ 
যেমন সুসংবাদ, সুনীতি, সুনির্মল, সুনির্মাণ
সুশাসন ইত্যাদি ইত্যাদি। 
মাধবীলতা, 
তুমি যেমনটা চাও
ঠিক সেরকম লিপিবদ্ধ হবে পৃথিবীর ইতিহাস। 
তোমার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে 
বিচার বিভাগ আইন বিভাগ 
এবং শাসন বিভাগ। 
তোমার আদেশে চালিত হবে 
মন্ত্রিপরিষদ;
সংসদ অধিবেশন। 

কেবল তোমার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে 
কিনে নেব একখণ্ড লুক্সেমবার্গ; নিরাপদ নগরী। 
নির্ভয়ে দাঁড়াব মার্কিনী বাহিনীর তোপের সম্মুখ;
সমুদ্রপথে দুজনে মিলে আবিষ্কার করে নেব 
পৃথিবীর 'অষ্টম' মহাদেশ। 
(যদিও আমি কলম্বাসের মতো বিচক্ষণ নই)
আবারও তোমার দিকে বাড়াব হাতের গোলাপ;
বাগানের সবচেয়ে কমবয়সী ফুলের তোড়া।




Previous Post Next Post