দুইদিকে দরজা পর্ব ১০

অনন্য কাওছার 

সকাল সাতটা বাজে। মনসুর মানিক হেলান দিয়ে ইজিচেয়ারে বসে আছেন। টেবিলে চায়ের কাপ। হাতে পাহাড় পয়েন্ট টুয়েন্টি সেভেন নামক গ্রন্থ। বইয়ের তিনশো বাহান্ন পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়ে তিনি ভাবছেন— তার্জিন সম্প্রদায় কেন নীলপরি অঞ্চলে নিজেদের আবদ্ধ  রেখেছে? যতটুকু পড়েছেন তাতে মনে হচ্ছে তাদের দানবাকৃতির চেহারার জন্য সাধারণ মানুষের থেকে তাঁরা ভিন্ন এবং অস্বাভাবিক। এছাড়া আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। যেমন, নীলপরি অঞ্চলের আবহাওয়ার সাথে এখানের আবহাওয়ার তারতম্য অনেক। অথবা পৃথিবীর মানুষের জীবনযাপন তাদের কাছে মোটেই পছন্দের না। এই কারণটাই মনসুর মানিকের কাছে যৌক্তিক আর নির্ভরযোগ্য মনে হচ্ছে। তাছাড়া নীলপরি অঞ্চলে একটা গনহত্যার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু 'পাহাড় পয়েন্ট টুয়েন্টি সেভেন' গ্রন্থে এই গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার পেছনের কারণ উল্লেখ নেই। 
    ড. মনসুর মানিকের কাছে মনে হচ্ছে পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে নীলপরি অঞ্চলের বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে গণহত্যার পর থেকে। এমনটা হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। এখনই সিদ্ধান্তে পৌঁছা ঠিক হবে না তাঁর। পাহাড় পয়েন্ট টুয়েন্টি সেভেন গ্রন্থ পুরোটা শেষ করে একটা সমাধানে পৌঁছোবেন বলে ঠিক করে নিলেন তিনি। মনসুর মানিক গবেষণার কাজে ইদানীং মনোযোগী হতে পারছেন না। একসপ্তাহ আসিফকে নিয়ে দুশ্চিন্তা আর পেরেশানিতে থাকায় এমনটা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। মনসুর মানিক পাণ্ডুলিপি টেবিলের ওপর রাখলেন। এবং চায়ের কাপ হাতে নিয়ে লাইব্রেরির চারিপাশে তাকালেন। লাইব্রেরিতে বইয়ের সংগ্রহ বাড়াতে হবে। আসিফের থেকে একটা বইয়ের  তালিকা চেয়ে নিলেই হয়। তখন আসিফের বাইরে থেকে বারবার বই কিনতে হবে না। ছেলেটা এতোটাই জ্ঞানপিপাসু যে একদিন তাঁকেও ছাড়িয়ে যাবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। 
     মানিক মনসুর চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। 
     কাপে চুমুক দিতেই মুখ থেকে চায়ের কাপ ফিরিয়ে নিয়ে তিনি আয়েশাকে ডাকলেন। আয়েশা জবাব দিল না। মনসুর মানিক আবারও ডাকলেন। আয়েশা বারান্দা থেকে জবাব দিল এবং মনসুর মানিকের লাইব্রেরিতে এলো। 
    জানা দরকার, মনসুর মানিক লাইব্রেরিটা বাড়ির এমন একটা পয়েন্টে তৈরি করেছেন যেখান থেকে ঠিক ওপরের দিকে আসিফের রুম। লাইব্রেরির ডানদিকে যথাক্রমে অর্পিতা এবং আয়েশার রুম। বামদিকে মনসুর মানিকের রুম। তাঁর পাশে রান্নাঘর। 
    মনসুর মানিক বললেন, আরেক কাপ চা বানিয়ে দিতে পারবে?
    জি চাচা। 
    অর্পিতা কি ঘুম থেকে উঠেছে। 
    আপা, ঘুম থেকে ওঠে ফ্রেশ হচ্ছেন। 
    তাঁকে লাইব্রেরিতে ডেকে দিও।
    জি আচ্ছা চাচা। 
    মনসুর মানিক আবারও পাহাড় পয়েন্ট টুয়েন্টি সেভেন বের করলেন। আয়েশা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলল, চাচাজি। আর কিছু লাগবে? 
    মনসুর মানিক বললেন, আর কিছু লাগবে না। মাত্র এক-কাপ চা।
    আয়েশা চলে যাচ্ছে। মনসুর মানিক পেছন থেকে ডেকে বললেন, আসিফ কি ঘুম থেকে উঠেছে? তাঁকে  নাস্তা দিয়েছো?
    ভাইজান প্রাইভেটে গেছেন। বলছেন, প্রাইভেটে নাস্তা করবেন। 
    মনসুর মানিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
    এবং ভ্রঁ-কুচকে বললেন, বাড়ি ফিরলে তাঁকে বলবে লাইব্রেরিতে আসতে। জরুরি তলব। 
    জি আচ্ছা চাচা, বলে আয়েশা রান্নাঘরের দিকে গেল।  অর্পিতা ফ্রেশ হয়ে আসিফের রুমের দিকে যাচ্ছে। আয়েশা টের পেয়ে বলল, আপা নাস্তাটা খেয়ে যান। ভাইজান রুমে নেই। প্রাইভেটে গেছেন। 
    অর্পিতা রেগেমেগে আগুন। সে একমুহূর্ত আর দাঁড়াল না, নিজের রুমের দিকে যাচ্ছে। আয়েশা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে অর্পিতার পেছনে পেছনে এলো। তাতে কোনো কাজ হলো না। অর্পিতা ভেতর থেকে দরজাটা বন্ধ করল। আয়েশা দরজার বাইরে থেকে ডেকে বলল, আপা, চা-টা খেয়ে নিন। ঠান্ডা হয়ে যাবে। 
   অর্পিতা জবাব দিল না। সে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না করছে। ইদানীং নিজেকে সে সামলাতে পারছে না বলে বারবার অহেতুক কষ্ট পেতে হচ্ছে। মেয়েদের এই কোমলমতি স্বভাবটা জন্মগত। অর্পিতা ঠান্ডা মাথায় একটা সিদ্ধান্ত নিল। সিদ্ধান্ত বেশ কঠিন। যতোটা কঠিন হোক অসাধ্যকে সাধন করতে হবে তাঁর। নতুবা আসিফের জন্য বারবার তাঁকে কষ্ট পেতে হবে। অর্পিতা সিদ্ধান্ত নিল আসিফের সঙ্গে কোনোরকম যোগাযোগ রাখবে না। হাজার-বার পরীক্ষায় ফেইল করলেও তাঁর কাছে প্রাইভেট পড়বে না বলে শপথ নিল। প্রয়োজন হলে বাড়িতে আলাদা চার-পাঁচজন শিক্ষক রাখবে সে। 
   আয়েশা আবারও বাইরে থেকে ডাক দিল। অর্পিতা চোখের জল মুছে নিয়ে দরজা খুলল। এবং চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলল, আমার সামনে আর আসিফের নাম উচ্চারণ করবে না। ঠিক আছে? 
   আয়েশা মাথা নেড়ে বলল, ঠিক আছে আপা।
   অর্পিতা দাঁতে দাঁত চেপে রুমে ঢুকলো। পেছন থেকে আয়েশা বলে উঠলো, মনসুর চাচা, লাইব্রেরিতে যেতে বলেছেন। জরুরি তলব। 
  অর্পিতা বলল, তুমি যাও। আমি যাচ্ছি। 
  জি আচ্ছা আপা।
  অর্পিতা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, চা বেশ ভালো হয়েছে। তোমাকে একটা কথা বলি।
  বলুন আপা।
  আসিফের কাছে একটা সংবাদ পৌঁছে দিবে। পারবে না?
  নিশ্চয়ই পারব।
  অর্পিতা এবার কঠিন গলায় বলল, তাঁকে বলবে। আজ থেকে আমাকে প্রাইভেট পড়ানো বন্ধ। আমি আর তাঁর কাছে প্রাইভেট পড়ব না। মনে থাকবে? 
  থাকবে। 
  অর্পিতা ফিসফিস করে বলল, খবর্দার বাবাকে জানাবে না। 
  চাচা যদি বুঝে ফেলেন। কিয়ামত হয়ে যাবে আমার। 
  বাবা জানবেন না।
  আয়েশা বলল, ভাইজান যদি বলে ফেলেন তাহলে?
  ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
  আয়েশা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। এবং বলল, চাচাজি বলেছেন লাইব্রেরিতে যেতে। জরুরি তলব। 
  অর্পিতা 'চা' শেষ করে লাইব্রেরির দিকে যাচ্ছে। ততক্ষণে আসিফ প্রাইভেট থেকে বাড়ি ফিরল। বারান্দায় অর্পিতা আসিফের মুখোমুখি হলো। মুখ ভেংচানো ছাড়া অর্পিতা কিছুই বলল না। দুতালার দিকে  আসিফ হেঁটে যাচ্ছে। পায়ের শব্দ হচ্ছে। পায়ের নিচে আহত হচ্ছে নীরব পদচারণ। 

(পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই আসবে) 




  
   
 
  
Previous Post Next Post