দুইদিকে দরজা পর্ব ০৯

অনন্য কাওছার 

আসিফ ভয় পেল না। অবশ্য ভয়ের কোনো কারণ নেই। ছোটবেলা থেকেই এরকম অনেক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিল সে। তাছাড়া, এই দুইজন নীলবর্ণী দানবাকৃতির মানুষকে তাঁর কাছে পরিচিত মনে হচ্ছে। কোথায় যেন তাদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, কথা হয়েছিল, এখন তা মনে করতে পারছে না বলে আসিফ  কিছুটা বিব্রত। আসিফ বিছানা থেকে ওঠে দাঁড়াল। নীল ডায়েরি টেবিলে রেখে দরজার দিকে এগিয়ে এলো। শাকু তার্জিন আসিফকে বললেন, আপনাকে স্বাগতম মহামান্য পঞ্চ তার্জিন। 
    আসিফ অবাক হলো। তাঁকে পঞ্চ তার্জিন বলার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। অবশ্য এই নামটা নীল ডায়েরিতে বড়ো অক্ষরে লেখা ছিল। আসিফ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তাগু বললেন, আপনি কি আমাদের রুমে প্রবেশের অনুমতি দিবেন মহামান্য পঞ্চ তার্জিন?
    আসিফ মুচকি হেসে বলল, অনুমতি নিতে চাইলে আগেই নিতে পারতেন। এখন তো প্রায়ই রুমের ভেতর ঢুকে গেছেন। 
   শাকু বললেন, আরেকটু বাকি। 
   তাগু তার্জিন বললেন, আপনি কি আমাদের সাহায্য করবেন মহামান্য?
   আমি কীভাবে সাহায্য করব? 
   শাকু বললেন, হাত বাড়িয়ে আমাদের ভেতরের দিকে শক্তভাবে টান দিন। তাহলেই হয়তো প্রবেশ করতে সহজ হবে।
   আসিফ উচ্চস্বরে হাসলো। কিচ্ছু বলল না। 
   শাকু তার্জিন আসিফের নীরবতা দেখে হতাশ হলেন। এবং আসিফের দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, আপনি কি চাচ্ছেন না আমরা ভেতরে প্রবেশ করি? 
   চাইব না কেন? 
   তাহলে ঢুকতে দিচ্ছেন না যে।
   আপনারা কোথায় থেকে এসেছেন? আসিফ বেশ কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল।
   তাগু তার্জিন বললেন, সেটা তো অবশ্যই জানবেন। তার আগে আমরা ভেতরে প্রবেশ করি। দুচার মিনিট বসে কথা বলি। 
    শাকু বললেন, মহামান্য। আপনি দেরি করবেন না। আমাদের সাহায্য করুন। ভেতর থেকে শক্তভাবে টেনে ধরুন। 
    আসিফ চাপা হেসে বলল, আমার শরীরে শক্তি নেই। আপনারা অনেক শক্তিশালী মানুষ। দেখে তো মনে হচ্ছে বহির্জগত থেকে এসেছেন। 
   শাকু তার্জিন বললেন, আমরা বহির্জগত থেকে আসিনি। আমরা তার্জিন সম্প্রদায়। আপনি ভেতর থেকে টান দিন। 
   শরীরে শক্তি নেই।
   কে বলল নেই। আপনি আমাদের থেকেও শক্তিশালী।  শাকু তার্জিন আবেগ মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন। আসিফ বিশ্বাস করল না। তাগু অবিশ্বাসের গন্ধ পেয়ে আসিফকে বললেন, বিশ্বাস হচ্ছে না তো।  তাহলে একবার চেষ্টা করে দেখুন না, আপনার শরীরে জো আছে কিনা?
   আসিফ শান্ত গলায় দরজার দিকে তাকাল। এবং তাগুকে বলল, আপনি পেছন থেকে সরে দাঁড়ান। একজন একজন করে ভেতরে ঢুকবেন। শরীর কাঁত করে এইভাবে ঢুকবেন বলে আসিফ দেখিয়ে দিল। আসিফের কৌশল বেশ কার্যকরী বলে মনে হচ্ছে। ভেতর থেকে শক্তভাবে টেনে ধরে শাকু তার্জিনকে প্রথমে প্রবেশ করালো আসিফ। তারপর তাগু তার্জিনকে। যদিও শাকু তার্জিনের হাতের কিছুটা অংশ মুচড়ে গেছে। তাতে কোনো অভিযোগ নেই তাঁর। 
    আসিফ তাদেরকে বসতে বলল। তাগু তার্জিন টপাস করে চৌকিখাটে বসতেই কাঠের পালঙ্ক ভেঙে গেল। আসিফ বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়ে আছে। তাদেরকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া ঠিক হয়েছে কিনা ভেবে নিচ্ছে সে। 
    আসিফ ভাঙা পালঙ্ক সরিয়ে নিল। এবং তাদেরকে মেজে বসতে বলল। শাকু তার্জিন নিচে বসলেন। তাঁর পাশে তাগু তার্জিন। নীল ডায়েরি হাতে নিয়ে আসিফ বলল, এই ডায়েরিটা আপনারা চিনবেন। হয়তো এই নীল ডায়েরির জন্যই আপনারা এখানে এসেছেন। 
   শাকু তার্জিন মুচকি হেসে বললেন, না। আমরা আপনার জন্য নীলপরি অঞ্চল থেকে এসেছি।  
   কেন এসেছেন?
   আপনি আমাদের তার্জিন সম্প্রদায়ের সর্বশেষ উত্তরসূরি। শাকু তার্জিন আন্তরিক গলায় বললেন। পাশে থেকে তাগু তার্জিনও সম্মতি দিলেন। আসিফ হাসতে হাসতে ডানহাতে চেয়ার টেনে বসলো। মিনিটখানেক কিছু বলল না। চুপচাপ। 
   তাগু বললেন, আপনি হাসছেন কেন মহামান্য পঞ্চ তার্জিন। আসিফ তাগু তার্জিনের কথা শোনে আবারও  হেসে উঠলো। তাঁর এই বজ্রহাসি কিছুতেই থামছে না দেখে শাকু বললেন, আপনি আমাদের তাচ্ছিল্য করছেন নাকি মহামান্য পঞ্চ তার্জিন? 
    আসিফ অনেক প্রচেষ্টায় হাসি থামাল। শাকু বললেন, আপনি ধীরেসুস্থে কথা বলুন। হাসবেন না মহামান্য। 
    আসিফ এবার কৌতূহলী হয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করল, আমার নাম পঞ্চ তার্জিন হতে যাবে কেন? আমি তো আসিফ আনোয়ার। 
    শাকু তার্জিন মুচকি হেসে বললেন, আপনি আমাদের তার্জিন সম্প্রদায়ের সর্বশেষ উত্তরসূরি। মহামান্য ভারুই তার্জিন আপনার পিতা। 
   আসিফ চুপচাপ বসে রইল। 
   এবার তাগু বললেন, আপনি কি ভুলে গেছেন নীলপরি অঞ্চলের ইতিহাস।
   আসিফ উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। 
   তারপর বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়ে বলল, নীলপরি অঞ্চলের ইতিহাস জানতে হবে কেন? 
   তাগু তার্জিন হতাশ গলায় বললেন, আমরা এখন চলে যাচ্ছি মহামান্য পঞ্চ তার্জিন। 
   শাকু তার্জিন ওঠে দাঁড়ালেন এবং আসিফের হাতে একটা 'নীল-আংটি' তুলে দিয়ে বললেন, এই আংটি আপনার পিতা মহামান্য ভারুই তার্জিনের শেষ নিদর্শন। নীলপরি অঞ্চলের ভবিষ্যৎ এখন আপনার হাতে। সমগ্র তার্জিন সম্প্রদায় আপনার দিকে তাকিয়ে আছে মহামান্য তার্জিন। এতটুকু বলে দানবাকৃতির এই দুই নীলবর্ণী তার্জিন বেরিয়ে এলেন। রাত্রি গভীর হচ্ছে। অরণ্যের ভেতর থেকে ভেসে আসছে একঝাঁক শেয়ালের হাঁক। 
   
(পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই আসবে) 


Previous Post Next Post