দুইদিকে দরজা পর্ব ০৮

অনন্য কাওছার 

আসিফ চোখ খুলে দেখল সে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে। তাঁর মুখোমুখি বসে আছে অর্পিতা। আসিফের হাতটা আলতোভাবে ধরে প্রার্থনা করছে। অথচ আসিফ কিছুই বুঝতে পারছে না। সে কখন হাসপাতালে আসলো, কেনইবা আসলো কোনোভাবে হিসেব মিলাতে পারছে না সে। শেষবার নীল ডায়েরি হাতে নিয়ে লিখতে বসেছিল। কী লিখেছিল তাও এখন আর মনে নেই। তারপর সরাসরি হাসপাতালে কেন আসতে হলো ভেবে ভেবে আসিফ উদ্ভ্রান্ত। আসিফ এতোকিছু ভাবতে চায়না আর। হয়তো হঠাৎ শরীর খারাপ করেছি বলে মনসুর মানিক তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। এছাড়া আর কোনো বিশেষ কারণ হতে পারে বলে তাঁর মনে হচ্ছে না। আসিফ আবারও চোখ খুলে হাসপাতালের চারপাশে তাকাল, তখনও অর্পিতা চোখবুঁজে প্রার্থনা করছে দেখে আসিফ হতবাক হলো। একটা মেয়ে এতোটা পেরেশান কেন হবে? এতটুকুও জানা নেই তাঁর। 
     আসিফ কাশি দিয়ে অর্পিতার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।  তাই একটানা তিনবার কাশি দিল সে। অর্পিতা আসিফের দিকে বিমর্ষ চোখে তাকাল। এবং কাজের ভুয়া আয়েশাকে ডেকে বলল, আয়েশা! বাবাকে আসতে বলো, আসিফ চোখ খুলেছে। 
     আয়েশা বলল, মনসুর চাচা, ঔষধ কিনতে গেছেন।
     বাবাকে টেলিফোন করো।
     জি আচ্ছা, আপা।
     আসিফ বেশ অবাক হলো। অবাক হওয়ার পেছনে খুবই সাধারণ একটা কারণ আছে। সেটা হলো, অর্পিতা  তাঁকে স্যার সম্বোধন না করে সামান্য বেয়াদবি করেছে। যদিও নাম ধরে ডাকা বড়ো ধরনের কোনো বেয়াদবি না। ডাকতেই পারে। আসিফ যে অর্পিতার ভাবমূর্তি চিন্তাচেতনার প্রতি বেখেয়ালি তা কিন্তু না। অর্পিতা যে তাঁকে পছন্দ করে সেটাও মনসুর মানিক জানেন এবং আসিফও বেশ অবগত। প্রাইভেট টিচার হিসেবে আসিফের সচেতনতা ছিল যথাযথ। 
   আসিফ বিছানা থেকে ওঠে বসলো। আয়েশা রুমে প্রবেশ করে বলল, ভাইজান পানি খাবেন? 
   আসিফ মাথা নেড়ে বলল, নিয়ে এসো।
   আয়েশা পানির গ্লাস হাতে নিয়ে অর্পিতাকে ধরিয়ে দিল। অর্পিতা আসিফের দিকে হাত বাড়িয়ে পানি দিয়ে বলল, একসপ্তাহ হলো আপনি নিখোঁজ। এতোদিন কোথায় ছিলেন। 
   আসিফ পানি পান করে অর্পিতার হাতে গ্লাসটা ধরিয়ে দিয়ে বলল, গতকালই তো বাড়ি ছিলাম। 
   গতকাল না, একসপ্তাহ হলো আপনি নিখোঁজ। 
   আসিফ কিছু বলল না। অর্পিতার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে ভাবলো, মেয়েটার মাথা খারাপ হলো না তো। গতকালই তো বাড়ি ছিলাম। হাসপাতালে কীভাবে এলাম। নিশ্চয়ই অর্পিতার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। মনসুর মানিক স্যার আসলে সবকিছু জানা যাবে। এখন মেয়েটার সঙ্গে কোনোরকমের কথা বলা যাবে না। তাছাড়া, অর্পিতা একবার নাম ধরে ডাকছে। কখনও যথোপযুক্ত সম্মান পূর্বক কথা বলছে। আসিফ একবার একটা বিদেশি বইয়ে পড়েছিল, মেয়েদের মাথা খারাপ হলে সে কখনও আজগুবি কথা বলে। কখনও নমনীয় ভাষা ব্যবহার করে। আর যখন সে কটুবাক্য বলতে শুরু করে তখন নিজের বাবাকেও ছাড়া দেয় না। আসিফ নিজের সম্মানের কথা চিন্তা করে এবার চুপ করে থাকবে। অর্পিতা আসিফের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, আপনি কথা বলছেন না কেন?
     পরে বলব।
     অর্পিতা নরোম গলায় বলল, এখন বললে কি হবে? 
     কিচ্ছু হবে না। 
     তাহলে বলুন। 
     কী বলব? আসিফ জিজ্ঞেস করল। 
     অর্পিতা হাসিমুখে বলল, একসপ্তাহ কোথায় ছিলেন? এটুকু বললেই হবে। 
     আসিফ কিছু বলল না। চুপচাপ বসে রইল।
     মনসুর মানিক ঔষধ নিয়ে ফিরে এলেন। আসিফকে মোটামুটি স্বাভাবিক দেখে তাঁর ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে সেদিনের ছোট্ট বালকের কথা, যে কিনা স্কুলের বারান্দায় ঘুমাতো এবং সকাল হলে রাস্তার অলিগলি ঘুরে বেড়াতো। তখন মনসুর মানিক সেই ছোট্ট বালকের   অসহায়ত্ব দেখে স্কুলে ভর্তি করে দেন এবং তাঁকে নিয়ে আসেন নিজের বাড়ি। সেই নামপরিচয়হীন ছেলেটার নাম রাখেন আসিফ। সেই ছোট্ট আসিফ কবে যে চোখের সামনে বড়ো হয়ে গেল। মনসুর মানিক নিজের ছেলের মতো তাঁকে বড়ো করেছেন এবং আসিফও তাঁকে কখনোই হতাশ করেনি দেখে তিনি বিমুগ্ধ।
     মনসুর মানিক আসিফকে দু-একটা ভালোমন্দ প্রশ্ন করার ছাড়া অতিরিক্ত কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না। ডাক্তারের পরামর্শে আসিফকে নিয়ে তাঁরা সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফিরলেন। আসিফ রুমের ভেতর শুয়ে আছে। চারপাশটা কেমন অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। টেবিলের ওপর নীল ডায়েরি। আসিফ ডায়েরি হাতে নিল। প্রথম পাতা উল্টাতে গিয়ে তাঁর শরীর শিরশিরিয়ে উঠলো। প্রথম পাতায় বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা— পঞ্চ তার্জিন। 
     জোছনার আলো অন্ধকারে ডেকে যাচ্ছে। বাড়ির পশ্চিমের বিশাল অরণ্যের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন নীলপরি অঞ্চল থেকে আসা শাকু তার্জিন এবং তাগু তার্জিন। মনসুর মানিকের ছাদে উঠে তাগু তার্জিন বললেন, পঞ্চ তার্জিন কি বাড়ি ফিরেছেন? সারাদিন তাঁকে দেখা গেল না।
      শাকু তার্জিন বললেন, তিনি হয়তো বাড়ি ফিরেছেন?
      তাগু তার্জিন এবার কৌতূহল হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কাছে কি পঞ্চ তার্জিনকে অবাক লাগে না? 
      কেন লাগবে? 
     এই যে তিনি পৃথিবীর মানুষের মতো সাধারণ। 
     শাকু তার্জিন বললেন, তাঁকে সাধারণ বলছ কেন?  তিনি আমাদের তার্জিন সম্প্রদায়ের সর্বশেষ উত্তরসূরি। 
     তাগু তার্জিন মুচকি হেসে বললেন, তিনি আমাদের মতো বিশাল আকৃতির না। এই কারণে জিজ্ঞেস করলাম। 
     শাকু তার্জিন বললেন, নীলপরি অঞ্চল থেকে পঞ্চ তার্জিনকে ছোটবেলা পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিল। বৈরী আবহাওয়া আর আধুনিক মানুষের সঙ্গে বেড়ে উঠায় তিনি আমাদের থেকে কিছুটা ছোট আকারের।
    তিনি কি নীলপরি অঞ্চলে আর আসবেন না?
    আসবেন। তার্জিন সম্প্রদায়ের দ্বায়িত্ব এখন পঞ্চ তার্জিনের হাতে। আমাদের পুর্বপুরুষের ইতিহাস ঐতিহ্য ঠিক থাকা বা না-থাকা নির্ভর করছে পঞ্চ তার্জিনের হাতে। শাকু তার্জিন এতটুকু বলে সূর্যের দিকে হাত বাড়ালেন। তাগু তার্জিন আবার জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি পারবেন আমাদের পূর্বপুরুষের ইতিহাস টিকে রাখতে? 
    শাকু বললেন, আমার মনে হয় তিনি পারবেন। আপনার কাছে কি মনে হয়? 
   তাগু তার্জিন কিছুই বললেন না। চুপ করে থাকলেন। তাগু তার্জিনের নীরবতা দেখে শাকু তার্জিন বললেন, চুপ করে থাকবেন না তাগু। বলেন, আপনার কি মনে হয়?
    তাগু বললেন, আমার মনে হয় তিনি পারবেন না।
    শাকু তার্জিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর হতাশ গলায় বললেন, আপনার কাছে কেন মনে হচ্ছে তিনি পারবেন না তার্জিন সম্প্রদায়ের ইতিহাস ঐতিহ্য রক্ষা করতে? 
     তাগু বললেন, প্রথম কারণ। পঞ্চ তার্জিন ভুলে গেছেন তিনি যে তার্জিন সম্প্রদায়ের সর্বশেষ উত্তরসূরি।  তিনি তাঁর ছোটবেলার কথা মনে করতে পারছেন না। মাঝেমধ্যে মনে হলেও তা কিছুদিন পর ভুলে যান। এখন  আপনিই বলেন তিনি কীভাবে আমাদের পূর্বপুরুষের ইতিহাস টিকে রাখবেন। 
      শাকু বললেন, আমার বিশ্বাস তিনি পারবেন। তাছাড়া আমরা পঞ্চ তার্জিনকে সহযোগিতা করব। আপনি কি ভুলে গেছেন আমাদের এখানে আসার উদ্দেশ্য? 
      তাগু মাথা নেড়ে বললেন, না। ভুলি নাই। 
      শাকু তার্জিন এবার বললেন, তাহলে চালুন। পঞ্চ তার্জিনের সঙ্গে দেখা করে আসি। তাগু তার্জিন জিহ্বা বের করে শাকু তার্জিনকে সম্মান জানালেন। 
     নীল ডায়েরি হাতে। আসিফ রুমের দরজা বন্ধ না করেই ঘুমিয়ে পড়লো। শাকু তার্জিন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আসিফকে ভালোভাবে দেখে নিচ্ছেন। তাগু তার্জিন অনুচ্চস্বরে বললেন, আমরা কীভাবে ভেতরে ঢুকবো। দরজাটা এতোটাই ছোট যে আমাদের বিশালাকার দেহ ভেতরে প্রবেশ করবে না। 
    শাকু বললেন, চেষ্টা করে দেখি কোনোভাবে ভেতরে প্রবেশ করতে পারি কিনা। 
    আসিফের রুমে প্রবেশের চেষ্টা করছেন নীলপরি অঞ্চল থেকে আসা শাকু তার্জিন এবং তাগু তার্জিন। ঘনঘন দরজা নাড়ানোর শব্দ পেয়ে আসিফের ঘুম ভেঙে গেল। সে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখল, দুইজন দানবাকৃতির নীলবর্ণী মানুষ। 

(পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই আসবে) 


Previous Post Next Post