অনন্য কাওছার
চারিদিকে মেঘের মতো অন্ধকার। আজ পৃথিবীতে সূর্যের দপদপ আলো প্রকটিত হয়নি। যেন রক্তিম আকাশ থেকে ছিটকে পড়ছে নীলের আভা। রিমিঝিমি। বৃষ্টি হচ্ছে। পাখিরা দলবেঁধে উড়ে যাচ্ছে অরণ্যের দিকে।
নীলপরি অঞ্চল থেকে দুইজন প্রতিনিধি মনসুর মানিকের বাড়ির ছাদে এলেন। তাগু তার্জিন আলতোভাবে আসিফকে নামালেন। এবং ধীর পায়ে নেমে এলেন বাড়ির পেছনের দিকে। বাড়ির পশ্চিমে একটা বিশাল অরণ্য। এই বনের ভেতর থাকতে হবে নীলপরি অঞ্চল থেকে আসা শাকু তার্জিন এবং তাগু তার্জিনকে। এই বনের পরিসর কিছুটা বিশাল থাকায় তেমন কোনো অসুবিধে হবে না তাদের। তবে চিন্তার বিষয়, নীলপরি অঞ্চলের আবহাওয়ার সাথে এখানের আবহাওয়ার কোনোরকম মিল নেই। তাছাড়া হরিণের কাচা মাংসের ভোজনোৎসব থেকে তাদেরকে অনেকদিন বঞ্চিত হতে হবে।
আসিফ জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে আছে। তাঁর সমস্ত শরীরজুড়ে নীলবর্ণী দাগ। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। অর্পিতা পড়ার টেবিলে বসে ভাবছে একটা মানুষ রাতারাতি কীভাবে উধাও হয়ে গেল। কাউকে না জানিয়ে বাসা ছেড়ে যাওয়ার মতো মানুষ আসিফ নয়। বাড়িঘর নেই, মা-বাবার কোনো স্মৃতিও মনে নেই যে তাদের কাছে সে চলে যাবে। নিকটাত্মীয় বলতে কেউ নেই তাঁর। ভার্সিটি লাইফে বন্ধুবান্ধব থাকলেও এখন আর কেউ নেই। এখানেই তাঁর বাড়িঘর। এখানেই তাঁর সব।
অর্পিতা আসিফের চেহারা চোখ থেকে সরাতে পারছে না। যতই দিন যাচ্ছে দুশ্চিন্তার ছাপ তাঁকে ভেতর থেকে মোমবাতির মতো গলিয়ে দিচ্ছে। আসিফকে পছন্দ করলেও কখনও সে মুখ ফুটিয়ে বলতে পারেনি। আগামীতে পারবে কিনা তা জানার চেয়েও আসিফ এখন কোথায় সেটা জানা দরকার।
অর্পিতা ঠিকঠাক মতো কিছুই খাচ্ছে না জেনে মনসুর মানিক ছুটে এলেন। রুমের প্রবেশ করে দেখলেন, অর্পিতা পড়ার টেবিলে বসে জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। মনসুর মানিকের উপস্থিতি অর্পিতা এখনও টের পায়নি। তাঁকে সচরাচর এলোমেলো চুলে দেখা যায় না। সর্বদা নিজে সাজগোজে রাখে বলে সবার চোখে সে অনন্যা। কিন্তু আজ তাঁকে এলোমেলো চুলে আর উদাসীন দেখে মনসুর মানিক ভেতর থেকে শোকাচ্ছ হলেন। মেয়েটার এমন কঠিন পরিস্থিতি নিজ চোখে দেখবেন তা কখনোই ভাবেননি তিনি।
মনসুর মানিক চোখের জল মুছে নিলেন। এবং নরোম গলায় বললেন, ঠিকঠাক মতো খাচ্ছ না শুনলাম। না খেলে কি হবে?
অর্পিতা ফিরে তাকালো। কিচ্ছু বলল না।
মনসুর মানিক কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, জবাব দিচ্ছ না কেন? বাবার ওপর রেগে আছো?
অর্পিতা মনসুর মানিককে জড়িয়ে ধরে বলল, বাবা, একটা মানুষ নিখোঁজ হয়ে গেল। এখনও তাঁকে খুঁজে পেলেন না। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে বাবা। এতটুকু বলেই অর্পিতা কান্নায় ভেঙে পড়ল। মনসুর মানিক সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, আসিফ হয়তো বাইরে কোথাও বেড়াতে গেছে। টেলিফোন নেই বলে হয়তো জানাতে পারেনি। এতে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই মা।
অর্পিতা কিছুটা কর্কশ গলায় বলল, একসপ্তাহ হয়ে গেল আসিফ বাড়ি নেই।
শীঘ্রই চলে আসবে।
কবে আসবে, কীভাবে আসবে? অর্পিতা উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল। মনসুর মানিক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, থানায় ডিজি করেছি। শীঘ্রই আসিফকে খুঁজে পাব। একসপ্তাহ হলো ঠিকমতো ঘুম নেই। পড়াশোনা নেই। এভাবে চললে বাবা কি ভালো থাকব?
অর্পিতা চুপচাপ বসে রইল। মনসুর মানিক মেয়ের হাতে চিরুনি ধরিয়ে দিয়ে বললেন এলোমেলো চুল আঁচড়ে নিতে। অর্পিতা চিরুনি হাতে নেয়নি বলে মনসুর মানিক বিব্রত হলেন। এবং নিজ হাতে মেয়ের চুল আঁচড়ে দিলেন। ছাদ থেকে আয়েশার চিৎকার শোনা গেল। মনসুর মানিক অর্পিতাকে জিজ্ঞেস করলেন, আয়েশা কোথায়?
ছাদে গেছে।
বৃষ্টির মাঝে ছাদে কি করতে গেল?
বৃষ্টিতে ভিজবে বলে।
ভিজবে ভালো কথা। কিন্তু ছাদ থেকে চিৎকার দিচ্ছে কেন?
কেন দিচ্ছে জানি না।
ছাদ থেকে আবারও আয়েশার চিৎকার শোনা গেল। বজ্রপাতে যেভাবে মাটি কেঁপে ওঠে তেমনি অর্পিতা কেঁপে উঠলো। মনসুর মানিক অর্পিতাকে সঙ্গে আসতে বললেন। অর্পিতা এবং মনসুর মানিক ছাদের দিকে দ্রুত পায়ে এগোচ্ছেন। বাইরে এখনও রিমিঝিমি বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশ থেকে অন্ধকার ক্রমশ সরে যাচ্ছে। ধীরেধীরে সাদা কবুতরের মতো রুপান্তরিত হচ্ছে সূর্যকরোজ্জ্বল দিন।
অর্পিতা সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠলো। এবং বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়ে দেখল, আসিফ উপুড় হয়ে ছাদে পড়ে আছে। তাঁর সমস্ত শরীরজুড়ে নীলবর্ণী দাগ।
(পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই আসবে)
