দুইদিকে দরজা পর্ব ১১

অনন্য কাওছার

মনসুর মানিক বই পড়ছেন। একটানা বই পড়তে পড়তে শরীরটা মেজমেজ করছে। চোখের কোণে ঘুমঘুম ভাব। তিনি ঘুম কাটাতে বাইরে বেরোলেন। বাড়ির সামনে একটা ফুলের বাগান। বাগানটা তাঁর স্ত্রী ফাতেমাতুন নিজহাতে লাগিয়েছিলেন। মনসুর মানিক মনখারাপ হলে বাগানে আসেন। বাগানের ভেতর নীরব ব্রাঞ্চে বসে থাকেন। তিনি বাগানের দিকে যাচ্ছেন। বারান্দায় অর্পিতাকে দেখে ডেকে আনলেন। বললেন, পড়াশোনা কেমন চলছে? 
    অর্পিতা কাঁপা গলায় বলল, মোটামুটি ভালো। 
    আসিফ কি নিয়মিত পড়ায়?
    জি বাবা। 
    ছেলেটা মাল্টিটেলেন্ট। ঠিক বলেছি না?
    জি ঠিক বলেছেন। 
    আসিফকে তোর কেমন লাগে? 
    যেমন লাগার তেমন লাগে। 
    সত্যি করে বল। এটা কোনো উত্তর হলো? 
    ভালো লাগে। অর্পিতা বিরক্ত হয়ে বলল।
    মনসুর মানিক মুচকি হেসে বললেন, কেমন ভালো?  মোটামুটি ভালো না সর্বোচ্চ ভালো? 
    শুধুই ভালো। বলে অর্পিতা মনসুর মানিককে পাল্টা প্রশ্ন করলো, আপনি কি এ কারণেই তলব করেছেন নাকি বিশেষ কোনো কারণ আছে? 
    বিশেষ কারণ তো আছেই। 
    তাহলে বলে ফেলুন। বলল অর্পিতা। 
    মনসুর মানিক বাগানের দিকে যেতে যেতে বললেন, বাগানে বসে গল্প করি।
    অর্পিতা মাথা নেড়ে বলল,  জি বাবা। 
    মনসুর মানিক বাগানের দিকে যাচ্ছেন। পেছনে পেছনে হেঁটে যাচ্ছে অর্পিতা। ফুলের সুগন্ধি ভরিয়ে তুলছে চারপাশ। দু-একটা প্রজাপতি উড়ে যাচ্ছে আকাশের দিকে। অর্পিতা বাগানের ব্রাঞ্চে বসলো। পাশে বসলেন মনসুর মানিক। তিনি মেয়েকে হাসিমুখে বললেন, পরীক্ষা শেষ হলে আসিফের সঙ্গে কথা বলব।
    অর্পিতা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, কী কথা বলবেন? 
    পাত্র হিসেবে ছেলেটা বেশ যথাযোগ্য। ঠিক বলেছি না? 
    ঠিক বলেছেন। কিন্তু আয়েশার মতামত জনা দরকার। অর্পিতা চাপা হেসে কথাটা বলল। মনসুর মানিক মেয়ের ভাবমূর্তি দেখে হতভম্ব হলেন। মেয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, আসিফের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে নাকি?
    অর্পিতা কিছু বলল না। চুপচাপ বসে রইল। 
    মনসুর মানিক কথা না বাড়িয়ে বললেন, মানুষের জীবনে রাগ-অভিমান থাকবেই। সবকিছু নিয়েই চলতে হবে। 
    অর্পিতা মনসুর মানিককে জড়িয়ে ধরে বলল, মায়ের কথা মনে পড়ছে খুব।
    মনসুর মানিক হাসিমুখে বললেন, আমারও মনে পড়ে। মনখারাপ হলে আমি এই বাগানে নীরব ব্রাঞ্চে বসে থাকি। একা একা কথা বলি। এই বাগানের দিকে তাকালে তোর মায়ের উপস্থিতি উপলব্ধি করি। মনসুর মানিক বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে যাচ্ছেন। মেয়ের সামনে চোখের জল ফেলাটা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতা বলে তিনি মনে করেন। এই এরকম কঠিন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে চাচ্ছেন না তিনি। একটা অহেতুক অজুহাত দেখিয়ে মনসুর মানিক বাগান থেকে চলে গেলেন। যাবার আগে বললেন, আসিফের সাথে কথা বলতে। অর্পিতা আসিফের রুমের দিকে যাবে কিনা ভেবে নিচ্ছে। 

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আসিফ ভাবলো, নীলপরি অঞ্চলের দানবাকৃতির তার্জিন সম্প্রদায়ের সর্বশেষ উত্তরসূরি নিশ্চয়ই সে নয়। তবে কেন তাঁকে পঞ্চ তার্জিন বলে মহাবিভ্রাট সৃষ্টি করছে নীলবর্ণী শাকু তার্জিন। তাদের উদ্দেশ্য কি হতে পারে তা বারবার উপলব্ধি করার চেষ্টা করছে। আসিফ নীল ডায়েরি হাতে নিয়ে ভালোভাবে লক্ষ্য করল। ডায়েরিতে সে এমন কিছু লিখেছে যা সাধারণ মানুষের অপাঠ্য। প্রতিটা পাতায় পাতায় দুর্বোধ্য কবিতার লাইন। 

(পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই আসবে)


Previous Post Next Post