অনন্য কাওছার
আসিফ বাইরে বেরোলো। হাতে সিগারেট। বারান্দায় বসে সিগারেট খাওয়া ঠিক হবে না। সেকারণে আসিফকে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠতে হলো। ডিপ্রেশন কাটিয়ে উঠতে সিগারেট এন্টিবায়োটিকের মতো কাজ করে বলে সে বিশ্বাস করে। আসিফ একটা সিগারেট ধরাল। সিগারেট টানার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা বাড়ির ছাদ। বাথরুমেও টানা যায় কিন্তু ধরা পড়ার সম্ভাবনা নাইন্টি-নাইন-পার্সেন্ট। আসিফ কোনো রিস্ক নিতে চায়না বলেই সিগারেট খেতে ছাদে আসে।
সিগারেট ফুঁকতে ফু্ঁকতে আসিফ ভাবছে পঞ্চ তার্জিন কি সে? না, এটা কোনোভাবেই সে বিশ্বাস করে না। তাহলে সে ভাবছে কেন? নিরুক্তি।
আসিফের একটা বিশ্রাম দরকার। পড়াশোনা আর প্রাইভেট পড়ানোর কারণে ঠিকঠাক বিশ্রাম নিতে পারছে না বলে হয়তো এমন হচ্ছে। রাত্রিবেলা তার্জিন সম্প্রদায়, দিনের বেলা ডিপ্রেশন আর হাবিজাবি ভাবনা। বস্তুত, দিনেদিনে কেমন জানি হয়ে যাচ্ছে আসিফ। উন্মাতাল। উদাসীন।
একটা বইয়ে একবার সে পড়েছিল, মানুষ বিশ্রামের অভাবে অথবা অতিরিক্ত একাগ্রতার কারণে নিজের অজান্তেই মস্তিষ্কে একটা বহির্জগত তৈরি করে ফেলে। মূলত মস্তিষ্কের নির্ঘন্ট থেকে এই বহির্জগতের উৎপত্তি। তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা কি দৃষ্টিবিভ্রম?
আসিফ ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত হচ্ছে। একের পর এক সিগারেট খাচ্ছে। কিন্তু কোনোভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে পারছে না। আসিফ সত্যি পাগল হয়ে যাচ্ছে কিনা, নিজেকে ডিপ্রেশনে তলিয়ে দিচ্ছে কিনা, চিন্তার বিষয়।
অর্পিতা আসিফের রুমে প্রবেশ করে তাঁকে পেল না।
অবশ্য আসিফ এখন ছাদে বসে বই পড়বে। নিয়মিত বইপড়া আসিফের অনিবার্য অভ্যেস। প্রাইভেট ছাড়া অতিরিক্ত কোনো কাজ নেই তাঁর। অর্পিতা ধীর পায়ে ছাদে উঠলো। আসিফের হাতে সিগারেট দেখে অর্পিতা কঠিন গলায় বলল, আপনি কি সিগারেট খান?
আসিফ তাড়াহুড়ো করে সিগারেট ফেলে দিল। থতমত খেয়ে বলল, কই- না তো।
অর্পিতা ফেলে দেওয়া সিগারেট হাতে নিয়ে রাগান্বিত হয়ে বলল, এইটা তাহলে কি?
সিগারেট।
ছাদে কীভাবে এলো?
জানি না।
কে জানে তাহলে?
হয়তো রাজমিস্ত্রী।
অর্পিতা বেশ অবাক হলো। কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, রাজমিস্ত্রী কীভাবে জানবে?
তাঁকে জিজ্ঞেস করো।
না, আপনিই বলবেন, এই সিগারেট এখানে কীভাবে এলো?
বললাম তো রাজমিস্ত্রী জানে।
রাজমিস্ত্রী কেন জানবে?
সিগারেট তো সে খেল। সেকারণে সে জানবে।
অর্পিতা কর্কশ গলায় বলল, রাজমিস্ত্রী আমাদের ছাদে কেন আসবে?
এই গতকাল না আসলো। বাড়ির কাজে।
আসিফের মিথ্যে বলা দেখে অর্পিতা হতবাক।
অর্পিতা এবার হাসিমুখে বলল, রাজমিস্ত্রী গতকাল আসেনি। একসপ্তাহ আগে এসেছে। একটা মিথ্যে ঢাকতে গিয়ে কতটা মিথ্যে বললেন হিসাব করেছেন?
না, করিনি। তুমি করেছো?
মিথ্যে বলবেন আপনি আর হিসাব করব আমি? অর্পিতা নরোম গলায় কথাটা বলল। আসিফ শান্ত গলায় বলল, সব হিসাব কি একা রাখা যায়?
যায় না বুঝি? অর্পিতা আসিফের চোখে চোখ রেখে কথাটা বলল। আসিফ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। কিছুই বলল না।
অর্পিতা এই প্রসঙ্গ পাল্টে নিয়ে আসিফকে জিজ্ঞেস করল, আপনি একসপ্তাহ কোথায় ছিলেন?
কোথায় থাকব। এখানেই তো ছিলাম।
আপনি একসপ্তাহ নিখোঁজ ছিলেন। সর্বত্র খুঁজে পাওয়া যায় নি বলে বাবা থানায় ডিজি পর্যন্ত করে রেখেছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কি জানেন?
না। জানি না।
অর্পিতা কাঁপা গলায় বলল, একসপ্তাহ নিখোঁজ থাকার পর আপনাকে এই ছাদে জ্ঞানশূন্য অবস্থা পাওয়া গেছে। এই কাকতালীয় বিষয় নিয়ে বাবাও বেশ কৌতূহলী।
আসিফ নির্বাক। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। কিছু বলল না। আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছে তাঁর সঙ্গে অদ্ভুত ব্যাপার স্যাপার ঘটেই যাচ্ছে কিন্তু এইসব কেন ঘটছে, কীভাবে ঘটছে? তাহলে কি তার্জিন সম্প্রদায় তাঁকে জীবনচক্রে প্রভাবিত করছে নাকি কাকতালীয় কিছু ঘটে যাচ্ছে দিনের পর দিন।
আসিফের চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা দেখে অর্পিতা কিছুটা বিব্রত। সে ভালোভাবে অবলোকন করে দেখল,
আসিফের শরীর থেকে নীলবর্ণী আলো চারিদিকে ছিটকে পড়ছে। চোখের নিচে জমা হচ্ছে ডিপ্রেশনের রক্তিম দাগ।
উল্লেখ্য যে, আসিফের এই অবাস্তব প্রতিচ্ছবি অর্পিতার কাছে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। কারণ এটা হতে পারে অর্পিতার নীল শাড়ি থেকে প্রতিবিম্বিত হওয়া নীলবর্ণ।
(পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই আসবে)
