দুইদিকে দরজা পর্ব ১৩

অনন্য কাওছার 

গভীর অরণ্য। চারপাশে বিশাল বটবৃক্ষ। সারি সারি গাছপালা। বনের পরিসর এতোটাই বিশাল যে একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তে পৌঁছোতে আট-নয় ঘন্টার প্রয়োজন। বনের ভেতর মানুষের প্রবেশাধিকার নেই। কারণ পুরো বন বিষাক্ত সাপের দখলে। বটবৃক্ষে হেলান দিয়ে শাকু তার্জিন মনখারাপ করে বসে আছেন। তিনি  সূর্যলোকের দিকে তাকিয়ে পূর্বপুরুষের সহযোগিতা চাচ্ছেন। তাগু তার্জিন সাপের মাংস চিবুচ্ছেন। কোনোরকম স্বাদ নেই। নীলপরি অঞ্চলের খাবারের মতো স্বাদ পাচ্ছেন না। এখানকার সবকিছু কেমন জানি  পানসে পানসে মনে হচ্ছে। নীলপরি অঞ্চলের সঙ্গে এখানের তারতম্য অনেক। পানি থেকে শুরু করে মানুষের জীবনযাপনেও তা পরিলক্ষিত। এখানে মানুষে-মানুষে দ্বন্দ্ব পরশ্রীকাতরতা রক্তক্ষরণ। তাগু তার্জিন সাপের মাংস চিবুচ্ছেন আর নীরবে ভাবছেন।
    বলাবাহুল্য, তাগু তার্জিন এমনই একজন দার্শনিক কবি; যাকে নীলপরি অঞ্চলের সমগ্র মানুষ অনুকরণ করে। শাকু তার্জিনও কোনো অংশে কম নন। তিনি কয়েকখণ্ড মহাকাব্য নির্মাণ করেছেন যা নীলপরি অঞ্চলের মানুষের কাছে সুপাঠ্য। মূলত নীলপরি অঞ্চলের সাহিত্যমান খাঁটি, দুর্বোধ্য এবং চর্যাপদের অনুরূপ।
    তাগু তার্জিন সাপের মাংস শাকুর দিকে বাড়িয়ে দিলেন। তিনি হাত বাড়িয়ে মাংস নিতে নিতে বললেন, সাপের মাংস খেতে ভালো লাগছে না। হরিণের কাচা মাংসের ভোজনোৎসব থেকে অনেকদিন বঞ্চিত। 
     শাকু তার্জিনের হাহাকার দেখে মুচকি হেসে তাগু বললেন, এই বনে বিষাক্ত সাপের মাংস ছাড়া কিছুই পাইনি। দু-একটা শেয়ালের হাঁক শুনতে পাওয়া গেলেও তাদেরকে হাতেনাতে ধরতে পারা বড়োই মুশকিল। 
    না, না, শেয়ালের মাংস আমাদের তার্জিন সম্প্রদায়ের জন্য নিষিদ্ধ। আপনি কি জানেন না মহামান্য তাগু তার্জিন। 
    তাগু হাসতে হাসতে বললেন, নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি মানুষের তীব্র আকর্ষণ জন্মগত। সেকারণেই তো চর্যাপদের কবি লিখেছেন— "আপনা মাংসে হরিণা বৈরী"
    শাকু তার্জিন বললেন, পরের লাইনটা যেন কি ছিল?
    তাগু বললেন, সম্ভবত পরের লাইনটা ছিল— "খনহ ছাড়অ ভুসুক আহেরী"
   শাকু তার্জিন সাপের মাংস চিবুচ্ছেন। আর বারবার পাঠ করছেন "আপনা মাংসে হরিণা বৈরী/খনহ ছাড়অ ভুসুক আহেরী" 
    তাগু তার্জিন কৌতূহলী হয়ে শাকু তার্জিনকে জিজ্ঞেস করলেন, মহামান্য শাকু। আপনাকে একটা কঠিন রকমের প্রশ্ন করব। আপনি কি প্রস্তুত? 
   শাকু মাথা নেড়ে বললেন, হ্যাঁ প্রস্তুত।
   তাগু বললেন, পৃথিবীর মানুষ কি এই চর্যাপদের কবিদের কথা জানে? 
   সম্ভবত জানে। তবে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত না। 
   তাদের জানা দরকার। 
   শাকু তার্জিন সাপের মাংস খেতে খেতে বললেন, পৃথিবীর মানুষ আমাদের নীলপরি অঞ্চল থেকেও অনেক এগিয়ে আছে। আমাদের জীবনযাপন প্রাচীনকালের মানুষের মতোই থেকে গেল। 
   তাগু বললেন, আপনি একদম ঠিক বলেছেন। অবশ্য আমাদের জীবনযাত্রার মান তেমন ভালো না হলেও আমরা নীলপরি অঞ্চলের মানুষ আধুনিক মানুষের থেকেও অনেক ভালো আছি। আপনি ভালোভাবে তাকিয়ে দেখুন, এখানকার মানুষ কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য না। একে অপরের সঙ্গে মারামারি হানাহানি আর যুদ্ধ-বিগ্রহে ব্যতিব্যস্ত। ঠিক বলেছি না?
    শাকু তার্জিন সজোরে বললেন, আপনি একদম ঠিক বলেছেন। 
    তাগু আরেকটি সাপের মাংস শাকু তার্জিনের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। শাকু তার্জিন বললেন, এই বিষাক্ত সাপের মাংস খেতে ইচ্ছে করছে না আর। পেটের ক্ষুধা৷ সাপের মাংস দিয়ে মিটবে না। 
    তাগু বললেন, তাহলে উপায়? 
    একটা উপায় অবশ্য আছে। তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। বললেন শাকু তার্জিন। তাগু সাপের মাংস ফেলে দিয়ে বললেন, মহামান্য। এখন কি খেয়ে থাকব? পেটের ক্ষুধা লাগামহীন বেড়ে যাচ্ছে যে।
    শাকু বললেন, রাত্রিকাল ছাড়া কোনো উপায় নেই। 
    আচ্ছা। উপায়টা কি জানতে চাই? 
    শাকু আপত্তি জানিয়ে বললেন, রাত্রিটা আসুক। 
    তাগু তার্জিন কিছু বললেন না। পুনরায় সাপের মাংস হাতে নিয়ে চিবুচ্ছেন। মনে হচ্ছে পেটের ক্ষুধা মিটবে না। 

রাত্রি গভীর হলো। 
অদ্ভুত আঁধার। 
    তাগু তার্জিন বটবৃক্ষে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছেন। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আছেন তিনি। সারাদিন এই অরণ্যে ভালো মাংসের সন্ধান করেছিলেন। কিন্তু কোনোভাবেই তিনি সফল হতে পারেননি। শাকু তার্জিন তাঁকে হাল্কা ধাক্কা দিয়ে বললেন, আপনি কি ভালো মাংসের সন্ধানে বাইরে যাবেন? 
    তাগু ঘুম থেকে লাফ দিয়ে উঠলেন। 
    বললেন, দেরি করছেন কেন? তাড়াতাড়ি চলুন। 
    তাড়াহুড়ো করবেন না। 
    ঠিক আছে মহামান্য। আমাদের পরিকল্পনা কি? 
    প্রথমত এই জঙ্গল থেকে বাইরে বেরোতে হবে। 
    তাগু বললেন, খুবই বিপদজনক। 
    বিপদজনক কেন মনে হচ্ছে আপনার, মহামান্য তাগু।
    বাইরের মানুষ যদি আমাদের একবার দেখে ফেলে? 
    শাকু বললেন, না। আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। তাহলে আর বিপদে পড়তে হবে না। 
    তাগু বললেন, মহামান্য। আমাদের বাইরে বেরোনো ঠিক হবে না। 
    ঠিক হবে না কেন?
    মানুষের চোখে একবার ধরা পড়লে। বেঁচে ফিরতে পারবো না। এখানকার মানুষ নিজের মায়ের পেটের ভাইকেও হত্যা করতে একবার ভাবে না। আমরা তো তাদের চোখে দানব তুল্য। 
   শাকু বললেন, তাদের চোখে দানবের মতো মনে হবে কেন?
    কারণ একেবারেই সহজ। আমাদের দেহের আকৃতি দানবের মতো। আপনি কি বুঝতে পারছেন মহামান্য শাকু তার্জিন। 
    ঠিক বলেছেন মহামান্য। 
    তাগু তার্জিন বটবৃক্ষের নিচে চুপচাপ শুয়ে পড়লেন। রাত্রি গভীর হচ্ছে। আকাশের মিটিমিটি তারকারা মেঘের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। বিপরীতে মনসুর মানিকের ছাদের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন মহামান্য শাকু তার্জিন। 

(পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই আসবে)


Previous Post Next Post