অনন্য কাওছার
মাস্টার সাহেব?
কোনো সাড়াশব্দ নেই। লোকটার বাঁ চোখের নিচে বড়ো রকমের কালো দাগ, ও চোখ অন্ধ। আরেক চোখে রিমিঝিমি দেখেন। কুড়ি বছর আগে প্রেমিকার খুনে কারাগারে বন্দী জীবন। তিনি কারাগার থেকে এখনও তো মুক্তি চান না; কিন্তু পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব তাঁকে বেরিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেন। স্বপ্ন দেখান। তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, আপনার বিষাদলিপ্ত বন্দীত্বের জীবন শেষ। নতুন করে বাঁচুন, আরও নানান মোটিভেশনাল কথাবার্তা।
অবশ্য মিথ্যে মামলায় কুড়ি বছর কারাবরণ করতে তাঁর কোনো অসুবিধে হয় নি। কিঞ্চিৎ মনখারাপও না। তিনি তো চেয়েছিলেন মৃত্যু অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। বিচারপতির বিরুদ্ধে উল্টো মামলা করা উচিত কিন্তু কীভাবে করবেন সেটাই ভাবছেন। পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব আবারও ডাকলেন, মাস্টার দার্কিলান সাহেব, আমাকে শোনতে পাচ্ছেন?
জি।
আপনাকে এতো পছন্দ করি কেন জানেন?
মাস্টার না-সূচক মাথা নাড়ালেন।
অফিসার হাসিমুখে বললেন, অনুমাননির্ভর বলুন দেখি।
আপনার মেয়ে রাজিয়ার প্রাইভেট টিচার ছিলাম। হয়তো একারণে।
অফিসার একটু সময় নিলেন। তারপর শক্ত গলায় বললেন, না-না। ঠিক সেকারণে নয়।
মাস্টার বললেন, ওঁ।
আপনার মধ্যে অদ্ভুত কিছু ব্যাপার আছে। তা কি আপনি জানেন?
মাস্টার উদাস গলায় বললেন, ওঁ।
আপনার কাছে কয়েকটা প্রশ্ন করবার ছিল। অনুমতি দিলে করতে পারি। ভালো কথা, এরপর কিন্তু সোজাসুজি বাড়ি চলে যাবেন। ঠিক আছে?
মাস্টার পুনরায় মাথা নেড়ে বললেন, ওঁ।
অফিসার একটা নিশ্বাস ফেললেন। তারপর মাস্টার সাহেবের দিকে তপ্ত চোখে তাকিয়ে বললেন, আপনি বারবার 'ওঁওঁ' করেছেন কেন? সুন্দরভাবে কি কথা বলতে পারেন না?
কী বলতে চান? বলুন। ক্ষীণ গলায় মাস্টার দার্কিলান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন। অফিসার জবাব না দিয়ে চাপা হাসি হাসলেন। তারপর প্রস্তাব সরূপ মাস্টার দার্কিলান সাহেবকে বললেন, কী খাবেন। চা না কফি?
ব্লাক।
ব্লাক-সিগারেট?
মাথা নেড়ে সায় দিলেন দার্কিলান। অতোটা বছর পর আবার সিগারেট খেতে পারবেন বলে আগে কখনও ভাবেন নি। সিগারেটের কথা শুনে তাঁর বিষণ্ণ চেহারাটা এখন বেশ আনন্দিত লাগছে৷ আনন্দের রঙটা কেমন? লাল। হলুদ। খয়েরি। যে রঙই হোক। তবে এতটুকু বলা যায় যে দিনের আলোয় সূর্য যেমন প্রকটিত তেমনি উজ্জ্বল আর অনুজ্জ্বল চেহারার ছাপে আনন্দ ও বেদনা উপলব্ধিত।
আনিস সিগারেট কিনতে বেরিয়ে এলো।
টেবিলের একপাশে মাস্টার দার্কিলান সাহেব; বিপরীত চেয়ারে হেলান দিয়ে পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব বসে আছেন। হাতে একটুকরো কাগজ। কোথায় থেকে শুরু করবেন তা অনিশ্চিত হলেও মাস্টার দার্কিলান সাহেব যে সবগুলো প্রশ্ন এড়িয়ে যাবেন, অন্তত এতটুকু সুনিশ্চিত অফিসার। তবুও ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়ে যাবেন বলে মনস্থির করেন। পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব কাগজ থেকে চোখ সারিয়ে নিতে নিতে বললেন, আপনি চেমিরেশকে চেনেন?
চিনলে কি আর না চিনলেই বা কি। এখন অবধি নিজেকেও পুরোপুরি চিনতে পারি নি। আর আপনি কোথাকার চেমিরেশ নিয়ে পড়ে আছেন।
কথাটা এড়িয়ে যাবেন না। সত্যি করে বলুন।
শুনুন অফিসার। জীবনে দুটো মিথ্যে বলেছি। একদিন মিথ্যাটাও অলৌকিক সত্যে রূপান্তরিত হবে। সেইদিন বেশি দূরে নয়। আশেপাশে কালো বিড়ালের মতো ঘুরঘুর করছে। আপনি কিছু কি বুঝলেন?
অফিসার একটা নিশ্বাস ফেললেন। তারপর টেবিলের দিকে খানিকটা ঝুঁকে এসে হতাশ গলায় বললেন, আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না।
সত্যি পারছেন না?
না। তা ছাড়া আপনি কথায় কথায় সত্য-মিথ্যা নিয়ে অদ্ভুত কথাবার্তা বলেন। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েও বলেছেন। তাহলে সত্যটা আমার কাছে প্রকাশ করুন।
মাস্টার কিছু বললেন না। অফিসার ভালোভাবে লক্ষ করলেন, মাস্টার দার্কিলান সাহেবের চোখ ক্রমশ লাল হচ্ছে। তিনি পাগলের মতো খিলখিল করে হাসছেন। হাসিটাও খুউব ভয়ংকর। হাসতে গেলেই তাঁর লম্বা দুটো দাঁত বের হয়ে আসে। এবারও দুটো বের হয়েছে। উসকোখুসকো লম্বা চুল আর মুখে অবিন্যস্ত সাদা দাঁড়ি-গোঁফ, দেখে ষাটোর্ধ বয়সী মনেহয় হলেও লোকটার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। অদৃশ্য কোনো সত্তার সাথে কথা বলার মতো আরও বেশকিছু অদ্ভুত আচরণ তাঁকে অতীতেও পুলিশ অফিসার করতে দেখেছেন। এখনও যে কার সাথে বিড়বিড়িয়ে কথা বললেন। কোনো গোপন সংবাদ দিতে আমরা যে দু-চারটে কথা বলি। তেমন কিছু। সংবাদ আদান-প্রদানের ব্যাপারটা নতুন না। তাঁকে প্রায়ই এমন করতে দেখা যায়। আগে দিনের তুলনায় অধিকাংশ সময় রাতে কথপোকথন করতে দেখা যেতো। ইদানীং দিবারাত্রির মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। অদৃশ্য সত্তার সাথে যখন-তখন আলাপচারিতায় লিপ্ত হন। যাইহোক।
এখানে একসাথে অনেকগুলো অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছে। এর মধ্যে একটা এরকম— মাস্টার পাগলের মতো হাসছেন। অথচ তাঁর অন্ধ-প্রায় চোখ থেকে কফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ছে। হাসি-কান্নার মিশ্রণ ব্যাপারটা অদ্ভুত। সম্ভবত ওটাকে বলা যায় Aesthetic সুখজল। সুখ থেকে উৎপন্ন হওয়া জলকে সুখজল বলে। আদৌও সুখজল বলে কিছু আছে? হয়তো আছে অথবা নেই। সুখজল নিয়ে গবেষণার বিষয়বস্তু আফজাল সাহেবের না। তাঁকে সাংবাদিক খুন তদন্ত নিয়ে এগোতে হবে। বাকি প্রশ্ন করবেন কিনা সিদ্ধান্তে পৌঁছতে না পেরে পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, মাস্টার সাহেব আপনি ঠিক আছেন?
মাস্টার জবাব না দিয়ে উদাস দৃষ্টিতে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছেন।
অফিসার বললেন, ওপরে তাকিয়ে আছেন কেন? আপনার কোনো অসুবিধে হলে বলতে পারেন নাকি আমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। যদি কথা বলতে না চান, তাহলে বলবেন না। এখন বাসায় চলে যেতে পারেন। চাইলে আমার বাসায়ও থেকে যেতে পারেন। আপনার ছাত্রী রাজিয়া খুব খুশি হবে। আমার মেয়ে বলেছে তার স্যারকে যেন বাসায় নিয়ে আসি। তাই বললাম আরকি।
মাস্টার কিছু বললেন না। তিনি ছাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। যেন কার সাথে বিড়বিড় করছেন।
অফিসার অবাক হয়ে বললেন, আপনি কার সাথে বিড়বিড় করে কথা বলছেন?
লিলি নিখোঁজ।
অফিসারকে তাক লাগিয়ে দিয়ে মাস্টার কথাটা বললেন। তারপর অফিসার মাস্টার সাহেবকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না। তাকে পেয়ে যাবেন৷
লিলি একটা অন্ধকার প্রাসাদে আছে।
অন্ধকার প্রাসাদের সংবাদ আপনি কীভাবে জানলেন? ভ্রঁ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন অফিসার।
মাস্টার দার্কিলান সাহেব এবার সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে এসে ফিসফিসিয়ে বললেন, আপনার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিরিসিনিকে জিজ্ঞেস করুন। ও একতুড়িতে সবকিছু বলে দেবে। ও আমার জন্য অনেকদূর থেকে সংবাদটা নিয়ে এসেছে।
হোয়াট! এখানে তো কেউ নেই।
মাস্টার ঝিম মেরে বসে রইলেন। কথা বললেন না। কুড়ি বছর ধরে তাঁর এমন ভৌতিক আচরণের সাথে পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব বেশ পরিচিত। কখনও লিলি আবার কখনও নিরিসিনি। অথচ তাঁর জীবনে লিলি কিংবা নিরিসিনির কোনো অস্তিত্ব নেই। জীবনে একের পর এক বিপর্যয় নেমে আসায় তিনি হয়তো অদ্ভুত। অবশ্য, এই ধরনের মানুষ অহর্নিশ বাস্তব-অবাস্তবে ঘূর্ণায়মান। বাস্তব জগতের চেয়ে কল্পনার জগতে নিজেকে আবিস্কার করতে এঁরা অধিক পছন্দ করেন। সে-নিয়মের পরিক্রমায় ফুটবলের মত মাস্টার দার্কিলান সাহেবও যথারীতি ঘুরছেন।
আনিসুর রহমান সিগারেটের প্যাকেট হাতে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে ভেতরে ঢুকলো। তার দিকে পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে বললেন, ডিউটি ফাঁকি দেওয়া ছাড়া, ঠিকমতো কোনো কাজ করতে পারিস না। সিগারেট কিনতে এতো সময় লাগে?
আনিস বলল, এই ব্রান্ডের সিগারেট কোথাও পাইনি স্যার।
হাতে ওটা কী?
সিগারেট। ডজনখানেক দোকানে তালাশের পর অবশেষে পেলাম।
ব্লাক নাকি অন্য কিছু?
ব্লাক।
দিয়াশলাই পেলি?
জি স্যার।
পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব হাত বাড়িয়ে সিগারেট আর দিয়াশলাই নিলেন। তাকে চোখ ইশারায় যেতে বললে সে বের হয়ে আসে। দরজার পাশে কানখাড়া করে দাঁড়ায়। আনিসুর রহমানের একাধিক বদঅভ্যেসের মধ্যে হয়তো এটাই অন্যতম। কোথাও গোপনীয়তার গন্ধ পেলেই কানখাড়া করে দাঁড়িয়ে থাকবে। তাতে ফায়দাও অনেক। বিনা পরিশ্রমে টাকার পাহাড় গড়তে পারার মতো অনেক সুযোগ সুবিধাও আছে। ইদানীং আফজাল সাহেব তাকে সন্দেহের চোখে দেখেন। আগে বিশ্বাস করতেন, এখন বিন্দুমাত্রও করেন কিনা কে জানে।
কয়েক-মিনিট পর মাস্টার দার্কিলান সাহেব ধীরেধীরে স্বাভাবিক হলেন। তারপর পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেবের দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, আপনার প্রশ্নোত্তর পর্বটা শেষ হয়েছে নাকি খামোখা এখানে বসিয়ে রাখবেন?
আচ্ছা বলুন দেখি, আপনার বিরুদ্ধে চেমিরেশের ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান কারণটা কী ছিল?
চেমিরেশ?
হ্যাঁ, চেমিরেশ। বিষাদায়ু উপন্যাসের লেখক।
তাঁর সঙ্গে মাত্র কয়েক ঘন্টার পরিচয়। সামান্য আলাপচারিতায় ভালো বন্ধুত্ব কিংবা শত্রু হওয়া বড়োই কঠিন।
আমার মনেহয় আপনি কিছু একটা লুকোনোর চেষ্টা করছেন।
মাস্টার ফিক করে হাসলেন। অফিসার মাস্টার দার্কিলান সাহেবের দিকে প্রখর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, একসুতো পরিমাণ কিছু বাদ দিবেন না। সবকিছু অভয়ে বলুন।
যা গুপ্ত তা কুড়ি বছর ধরেই হৃদয়ে সুপ্ত আছে। এতটুকু বলে মাস্টার খিকখিক করে হাসলেন।
অফিসার বললেন, আমাদের হাতে কিন্তু পর্যাপ্ত সময় নেই। আপনি অতীত নিয়ে লুকোচুরি খেলা বাদ দিয়ে সবকিছু খুলে বলুন। আর ভালো করে মনে রাখবেন, চেমিরেশকে পাকড়াও করতে আপনার গুপ্ত ইনফরমেশন 'সাংবাদিক খুন তদন্তে' বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। কুড়ি বছর আগে আপনার সাথে ঠিক কী ঘটেছিল তার পুঙ্খানুপুঙ্খ জানতে চাই।
মাস্টার বললেন, আমার অতীত আর বর্তমান দুটোই তো এক।
বলতে থাকুন আমি শুনছি।
অফিসার খুব আগ্রহ নিয়ে কানখাড়া করে বসে রইলেন।
মাস্টার মৃদু হাসলেন। তারপর বাঁকা চোখে আফজাল সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, অতো আগ্রহ দেখানোর কিছু নেই। আপনি কি ভুলে গেছেন আমি একজন খুনি?
আপনাকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছিল বলে আমার ধারণা।
মাস্টার তিরস্কার করে বললেন, ধারণা?
হুঁ। কেবল ধারণা বলছি না, নিরেট সত্যও বটে।
মাস্টার অফিসারের কথায় আপত্তি জানিয়ে বললেন, না। আমি খুনি। আমি নিজ হাতে আমার পছন্দের মানুষটাকে খুন করেছি। আমি থিহি সুলতানার খুনি।
মাস্টার সাহেবকে থামিয়ে অফিসার বললেন, আশ্চর্য! আপনার এই মিথ্যে স্বীকারোক্তির জন্য কুড়ি বছর কারাবরণ করেছেন। এখন অবশ্য কারাগার থেকে বেরিয়ে যাবেন। তবে যাবার আগে চেমিরেশ সম্পর্কে যথার্থ ইনফরমেশন দিয়ে তাঁকে আইনের আওতায় আনতে সাহায্য করুন। প্রশাসন অনেক আগেই চেমিরেশকে ধরতে পারতো যদি-না আপনি মিথ্যে স্বীকারোক্তি দিয়ে নিজেকে কাঠগড়ায় অপরাধী প্রমাণ করতেন।
মাস্টার চুপচাপ বসে রইলেন। কিছু বললেন না।
অপরদিকে অফিসার চিন্তিত গলায় বললেন, দেখুন মাস্টার। সদ্য ঘটে যাওয়া বিষাদায়ু উপন্যাস কেন্দ্রিক সাংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিক মিনার আহমেদ মার্ডার হওয়াতে চেমিরেশকে পাকড়াও করার আরেকটা সুযোগ করে দিয়েছে। যদি আপনি আন্তরিক হয়ে ঘটনা খোলাসা করেন, তাহলে তাঁকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করতে অনেক সুবিধে হবে। সেহেতু বিষাদায়ু উপন্যাস কেন্দ্রিক মার্ডারে আপনার নামটাও কাকতালীয়ভাবে ওঠে এসেছে। সেকারণে আপনার জবানবন্দি ইম্পর্টেন্ট বলে আমি মনে করছি।
মাস্টার নড়েচড়ে বসলেন। অফিসার বড়ো বড়ো নিশ্বাস ফেলে বললেন, আপনি কি চেমিরেশকে কোনো কারণে ভয় পাচ্ছেন অথবা এমন কিছু কি গোপন রয়েছে, যেকারণে আপনি নিজের ঘাড়ে সমস্ত অপরাধ অনায়াসে চাপিয়ে নিচ্ছেন। অথচ সাহস করে কিছুই বলতে পারছেন না।
এছাড়া আর কী কী মনে হয় আপনার? মাস্টার ভ্রঁ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন।
অফিসার বললেন, মনে তো অনেক কিছুই হয়। থিহি সুলতানার লাশটাও তো পাওয়া যায় নি। Without one finger. অবশ্য সেটা থিহি সুলতানার ছিল বলেই আপনি ফেঁসে গিয়েছিলেন।
মাস্টার দার্কিলান এবার রেগেমেগে বললেন, থিহি সুলতানার ঘাড় মটকে সামুদ্রিক হাঙরের মতো গিলে ফেলেছিলাম। তাই লাশটাও পাওয়া যায় নি, এখন কি বিশ্বাস হয়েছে?
খুনটা তো আপনি করেন নি। অন্য কেউ হয়তোবা করেছিল। সেটা বিচারপতিসহ অনেকেই জানতেন। একটা ভিডিয়ো ফুটেজের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে আপনাকে ফাঁসানো হয়েছে। ভিডিয়োটাও অভিনয়কৃত ছিল। সেদিন নিজেকে থিহি সুলতানার খুনি বলে স্বীকারোক্তি দিলেন কেন, বলুন?
মাস্টার দার্কিলান সাহেব কোনো জবাব দিলেন না। টেবিলের ওপর সিগারেট। হাত বাড়িয়ে দিয়াশলাই আর ব্লাক সিগারেট দখলে নিলেন। অতীতের দাবানলে পুড়তে পুড়তে ছাই না-হয়ে কীভাবে যে পাথর হলেন। তাই ভাবছেন। মাস্টার দার্কিলান সাহেব দুটো সিগারেট একত্রে জ্বালিয়ে দীর্ঘ টান দিতে লাগলেন। তাঁর সিগারেটে খাওয়ার কয়েকটি বিশেষত্ব আছে। এরমধ্যে একটি হল, তিনি যখনই সিগারেট খেতে বসেন তখন স্রেফ একটা না; একসাথে দুটো সিগারেট খান। আর সেটা কেবল ব্লাক সিগারেট। অন্য কোনো ব্রান্ড হলে নিসন্দেহে না। অবশ্য এর পেছনের কারণটাও খুব ইন্টারেস্টিং। সিগারেটের গল্পটা নাহয় পরেই বলা যাবে।
মাস্টার সিগারেট ফুঁকছেন। ব্লাক সিগারেট। অপরদিকে অফিসার সিগারেটের দিকে হা করে তাকিয়ে আছেন। দশেক মিনিটের মধ্যে পুরো সিগারেটের প্যাকেট শেষ। বিষয়টা বড়োই অদ্ভুত।
রাত এগারোটা। মাস্টার দার্কিলান সাহেব কারাগার থেকে বেরিয়ে পাঁচ ঘন্টা যাবত রাস্তার পাশে ভিখারির মতো জড়োসড়ো হয়ে বসে আছেন। হাতের আঙুল দিয়ে ছবি আঁকেন। খুব সুন্দর একটি ছবি। দেখে মানুষের মতো মনে হলেও ছবিটা মানুষের নয়। দু'মিনিট পরপর বিড়বিড়িয়ে কথা বলেন। কখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসেন। হাসিটা মোটেই মহানন্দের নয়; পোড়-খাওয়া জীবনের বিষাদ থেকে উৎসারিত। যেন কোনো অদৃশ্য সত্তা তাঁকে পরিচালনা করছে। ও নাচতে বললে তিনি নাচবেন। হাসতে বললে হাসবেন। ছবি আঁকতে বললে আঁকবেন। মাস্টার দার্কিলান সাহেব এরকমই হঠাৎ বদলে যান। বদলে যাওয়ার মুহূর্তে চোখ লাল হয়। একা-একা কথা বলেন। কথাগুলো অনুবাদ করলে অনেকটা এরকম—
বন্যপশুর গোঙানির শব্দে বলা হয়, মাস্টার দার্কিলান সাহেব, অন্ধকার প্রাসাদে আপনাকে স্বাগতম। হা। হা৷ হা।
অদৃশ্য সত্তার সাথে তাল মিলিয়ে মাস্টার দার্কিলান সাহেবও দাঁত বের করে পাগলের মতো হাসতে লাগলেন। লম্বা দুটো দাঁতের আঘাতে ঠোঁট ফেটে রক্ত বেরুচ্ছে। তবুও তিনি হাসছেন। তাঁর এমন রহস্যময় হাসির শব্দ শোনে চতুর্পাশে মানুষ জড়ো হওয়া শুরু করল। অবিশ্বাস্য ব্যাপার, প্রায় ঘন্টাখানেক হাসতে হাসতে মাস্টার দার্কিলান সাহেব বেহুঁশ হয়ে মাটিতে পড়ে যান। কারাগার থেকে অনতিদূর মানুষের হৈচৈ-চেঁচামেচি শোনে পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। সহজসরল মানুষটার এমন বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে তাঁর একটু মায়াই যেন হল।
আফজাল সাহেব জানতেন, মাস্টার দার্কিলান সাহেবের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। তাঁর আপনজন বলতে শয্যাশায়ী বুড়ো মা-বাবা আর একটিমাত্র আদুরের বোন ছিল। তাঁর নাম লায়লা। কারাগারে কয়েকমাস যেতে না যেতে একজন বৃদ্ধ চাচা খবর নিয়ে এলেন। কেন্দ্রীয় কারাগারে কথপোকথন।
এখানে কী চাই চাচা?
আমার ভাতিজারে দেখতে এলাম।
নামটা বলুন।
দার্কিলান। মাস্টার দার্কিলান।
আপনি তাঁর নিকটাত্মীয়?
না, গ্রামের মতলব চাচা। কতদিন হয় ভাতিজাকে দেখি না।
আপনি পরে আসেন। আজকে দেখা করতে পারবেন না।
মতলব চাচা রাগান্বিত হয়ে বললেন, দেখা করতে পারবো না মানে? অবশ্যই দেখা করে তারপর যাবো।
আরে চাচা। রাগ করছেন কেন?
রাগ তো করবই। ভাতিজার কাছে একটা সংবাদ নিয়ে এসেছি। খুব জরুরি সংবাদ।
মাস্টার সাহেবকে খবর পাঠানো হয়েছে। তিনি এখন কারো সাথে দেখা করতে চান না। আপনি চলে যান। আর ডিস্টার্ব করবেন না।
মতলব চাচা মনখারাপ করে চলে গেলেন৷ তিনি একটা মৃত্যুর সংবাদ নিয়ে এসেছিলেন। মাস্টার দার্কিলান সাহেবের ছোট বোন লায়লা। সে গতকাল স্বামীর পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে একটা-পর্যায় মারা যায়। সামান্য টাকার জন্য লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে লায়লাকে খুন করা হয়। মাস্টার দার্কিলান সাহেব খবরটা শোনে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। কোনো কথা বললেন না৷ লায়লার স্বামী প্রায় শশুরবাড়ি থেকে টাকা-পয়সা চাইতো। মাস্টার দার্কিলান সাহেব তাঁর একমাত্র বোন লায়লার সুখের জন্য আবদার পূরণের চেষ্টা করতেন। যদিও মাস্টার দার্কিলান সাহেব তাঁর বোন লায়লাকে সবসময় ভালো কোথাও বিয়ে দিতে চাইতেন কিন্তু দারিদ্রসীমার মারপ্যাঁচে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। পনেরো দিন পর আবারও মতলব চাচা আরেকটা সংবাদ নিয়ে এলেন। সেটাও ছিল মৃত্যুর। মাস্টার দার্কিলান সাহেবের বৃদ্ধ বাবা-মা অনাহারে অচিকিৎসায় মারা যান। মাস্টার দার্কিলান সাহেব সংবাদটা শোনামাত্র পাথরের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। কোনো কথা বললেন না। তারপর পাগলের মতো দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে চিৎকার করতে করতে কেন্দ্রীয় কারাগার মাথা তুললেন।
দোতলা বাড়ি। বিদেশি ডিজাইনের নিখুঁত কারুকার্যময় বাড়িটিতে পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব থাকেন। চারেক মাস আগে তাঁর কন্যা রাজিয়া আর সহধর্মিণী রুবিয়াকে ফ্রান্সে পাঠিয়েছেন। বলতে গেলে চমৎকার বাড়িটিতে এখন তিনি একা-একা বসবাস করছেন। যদিও বাবুর্চি কাহিল রান্নাবান্না করে চলে যায়। মাঝেমধ্যে আফজাল সাহেবের ভীষণ পীড়াপীড়িতে বাবুর্চি কাহিল দোতলার একটা ছোট্ট কামরায় থেকে যায়।
মাস্টার দার্কিলান এখনও আরাম করে তুলতুলে বিছানায় শুয়ে আছেন। লোকটা ভৌতিক হলেও কেন জানি একজন সাদামাটা নিরীহ মানুষ বলেই মনেহয়। রাস্তায় বেহুঁশ হয়ে পড়ে যাওয়ার পর পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব তাঁকে বাসায় নিয়ে এলেন। কোনো আন্তরিকতার কমতি দেখাননি বলে বাবুর্চি বেশ অবাকই হল। সে আগে কখনও আফজাল সাহেবকে এতো আদর আপ্যায়ন করতে দেখেনি। লোকটা বিশেষ কেউ হবেন বলে বাবুর্চি কাহিল ধরে নিল।
আফজাল সাহেব ডাকলেন, কাহিল। ও কাহিল।
জি স্যার।
আজ বাড়ি থেকে কোথাও বের হবি না।
কিন্তু আপনি—
কোনো কিন্তু-টিন্তু নেই। কাজকর্ম ঠিকঠাক মতো করবি। কোনোরকম ফাঁকিবাজি করিসনে। ঠিক আছে?
ওকে স্যার।
আরেকটা কথা।
বলুন।
মাস্টার দার্কিলান সাহেব ঘুম থেকে ওঠে গেলে পেটভরে খেতে দিবি। অনেকদিন হল লোকটা ঠিকমতো ভালোমন্দ কিছু খেতে পারেন নি। বেচারার জন্য আফসোস হয়।
আফজাল সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে কাহিল বলল, খেতে অসুবিধে কী?
তিনি কুড়ি বছর ধরে কারাগারে ছিলেন।
কেন?
থিহি-খুনের ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হয়ে। অবশ্য, সার্বিক ঘটনাপ্রবাহ অনুধাবন করে বলা যায়, লোকটা আসলেই নির্দোষ। একদম সাদাসিধা মানুষ।
তাহলে সাজা হল কেন?
গম্ভীর গলায় আফজাল সাহেব বললেন, এইখানে অর্থাৎ এই জগতে নির্দোষী দোষী। অসাধু সাধু। নিরপরাধীর কারাদণ্ড আর অপরাধী ক্ষমতাবলে গায়ে লিলুয়া-বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানোই তো সুন্দর।
কাহিল কিছু বলল না। জ্ঞানী মানুষের কথাবার্তা কেবল জ্ঞানীরা বিশ্লেষণ করতে পারে বলে তার ধারণা। সে তো সামান্য বাবুর্চি। সুতরাং আফজাল সাহেবের দামী কথার সঠিক মর্ম বোঝার শক্তিটুকুও তার নেই। কাহিল কানখাড়া করে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে আফজাল সাহেব নরম গলায় বললেন, মাস্টার দার্কিলান সাহেব ঘুম থেকে ওঠে ভৌতিক আচরণ করতে পারেন। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সাবধান থাকবি।
হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ে কাহিল।
তারপর ভয়ে-ভয়ে বলল, মাস্টার সাহেব কিছু ভাঙচুর করতে পারেন?
না, ভাঙচুর করবেন বলে মনেহয় না। করলেও আপত্তি নেই। মাস্টার দার্কিলান সাহেব শিক্ষক মানুষ। হয়তো সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ঠিক আছে?
জি।
আর হ্যাঁ, বিশেষ কোনো প্রয়োজন হলে টেলিফোন করবি।
জি স্যার।
হালকা নাস্তা করে আফজাল সাহেব বাসা থেকে বেরিয়ে এলেন। বাবুর্চি কাহিল পেছন থেকে উঁচু গলায় বলল, স্যার। কয়টার দিকে ফিরবেন?
রাত ন'টা। আর কিছু বলবি?
ইয়ে মানে—
কী আমতাআমতা করছিস। তাড়াতাড়ি বলে ফেল। আমার ভীষণ তাড়া আছে। কথাসাহিত্যিক চেমিরেশের বাসায় যেতে হবে। ইম্পর্ট্যান্ট একটা কাজ আছে।
বাবুর্চি কাহিল বলল, স্যার আজকে তো আমার ছুটিতে যাওয়ার কথা।
কয়েকদিন পর যাবি। অসুবিধে নেই তো?
যেতে পারলে ভালো হতো স্যার।
দুদিন পর যা। দেখতেই তো পারছিস। আমি একা মানুষ রান্নাবান্না করতে অসুবিধে হয়। তাছাড়া, মাস্টার দার্কিলান সাহেবকে বাসায় একা রাখা মোটেই ঠিক হবে না। বয়স্ক মানুষ না জানি কী করে বসেন।
জি।
অফিসার বললেন, মনখারাপ করলি?
জি-না স্যার। ছেলেটা অসুস্থ। ভালো ডাক্তার দেখাতে পারলে খুব ভালো হতো।
আচ্ছা ঠিক আছে। আগামীকাল যেতে পারিস। আরেকটা কথা।
বলুন।
তোর ছেলের চিকিৎসার খরচ-বাবদ কত আসতে পারে?
হিসেবে করি নি, স্যার।
নিশ্চিত হয়ে বলিস।
অফ কুট স্যার।
কী?
অফ কুট।
পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব হাসতে হাসতে বললেন, ওটা অফ কুট না রে পাগল। Of course. অব কোর্স বল।
কাহিল শুদ্ধরূপে পড়তে যেয়ে পুনরায় ভুল পড়ল। দুবার তিনবার চেষ্টা করেও শুদ্ধরূপে বলতে পারেনি দেখে আফজাল সাহেব একটা কাগজে 'Of course' শব্দের ইংরেজি বাংলা দুটোই লিখে দিলেন। তিনি জীপ নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে শব্দটা একশো বার পড়তে বললেন। কেবল আস্তে পড়লে চলবে না তাকে উচ্চস্বরে পড়তে হবে। সেজন্য কাহিল শব্দটা চিৎকার করতে করতে পড়ছে। প্রায় বাষট্টি বার পড়ে সামান্য বিরতি নিল। পুনরায় পড়া শুরু করতেই বাসায় ভৌতিক কিছু লক্ষ করে কাহিল। পুরো বাড়ি ফাঁকা অথচ দোতলা থেকে বিকট শব্দে কেউ কান্না করছে। মাস্টার দার্কিলান সাহেব হলে সে অতটা অবাক হতো না। তার ভয়ের একাধিক কারণ। মেয়েলি গলায় কেউ কবিতা পড়ে। আবার খিলখিল করে হাসে। কখনও নূপুরের শব্দ। কখনও ছাদের ওপর দৌড়াদৌড়ি। আগে কখনও এরকম হয় নি। মাস্টার দার্কিলান সাহেব বাড়িতে আসার পর থেকে বেশকিছু অদ্ভুত ব্যাপার সে উপলব্ধি করে। গতরাতেও ভালোমতো ঘুমায় নি। চোখবুঁজে অনেকবার চেষ্টা করেছে। তবুও না। আর চোখ বন্ধ করলেই সে দেখে, অন্ধকার প্রাসাদে দাঁড়িয়ে কেউ হাসছে। হাসিটা সাধারণ নয়, খুব ভয়ংকর। শয়তানের দাঁতের মতো দুটো লম্বা দাঁতের ভৌতিক হাসি। লোকটাকে দেখতে অবিকল মাস্টার দার্কিলান সাহেব মনে হলেও দুজনের মধ্যে অনেকটা তফাৎ আছে। পার্থক্য কোথায় স্মরণ নেই। ঘুম থেকে উঠে অনেকবার মনে করার চেষ্টা করেও সে ব্যর্থ হল। তারপর কাহিল সে রাতে আর ঘুমায় নি, বাতি জ্বালিয়ে সারারাত কোরআন তেলাওয়াত আর নফল নামাজ পড়ে কাটিয়ে দিল।
কাহিল দোতলার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করে। তার হাত-পা থরথর করে কাঁপছে। কপালে শিশিরবিন্দুর মতো পতনোন্মুখ ঘাম। কাহিল তার নিশ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ ছাড়া এখন আর দ্বিতীয় কোনো শব্দ শোনতে পেল না। দোতলার একটা কামরায় মাস্টার দার্কিলান সাহেব ঘুমিয়ে আছেন। সেটা চেক করা হয় নি দেখে কাহিল পুনরায় সেই রুমটার দিকে এগোয়। সেদিকটাতে যেতে মন কিছুতেই সায় দেয়নি, প্রবল অস্থির বোধ করায় সে ফিরে এলো। তাৎক্ষণিক পেছন থেকে কে জানি আওয়াজ দিল।
‘এই!—দাঁড়া।’
কাহিল ফিরে থাকায়। কেউ নেই। ভয় না পাওয়ার জন্য সে একটা কৌশল শিখে রেখেছে। সেটা কাজে লাগানো উচিত। নয়তো ভয়ংকর কিছু ঘটতেও পারে। বাবুর্চি কাহিল পশ্চিম দিকে মুখ ফিরিয়ে উচ্চস্বরে আযান দেয়। আযানের ধ্বনি তাকে মুক্তি দিতে পারে বলে সে বিশ্বাস করে। বিশ্বাস নিয়ে কিছু করলে সেটা খুব সহজেই পরিপূর্ণ হয়। কাহিলের বেলায়ও তাই হল। পবিত্র আযানের ধ্বনি তাকে ভেতর থেকে একজন সাহসী মানুষ বানিয়ে তুলল। কাহিল ভাবল— আর কোথাও বিপদে পড়লে প্রথমে ঠিক এই বুদ্ধিটা কাজে লাগাবে। তাতে কিছুটা হলেও ভয় কেটে যাবে। ময়মুরুব্বির মুখবুলি কাজে লাগে সে জানতো। তবে এতো তাড়াতাড়ি প্রমাণচিত্র পেয়ে যেতে পারে বলে সে আগে কখনও ভাবে নি।
সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে নিচতলায় নামতে গিয়ে কাহিল দেখতে পেল, ঘাড়-ত্যাড়া করে মাস্টার দার্কিলান সাহেবের মতো কেউ দাঁড়িয়ে আছে। লাল চোখ।
কোনো সাড়াশব্দ নেই। লোকটার বাঁ চোখের নিচে বড়ো রকমের কালো দাগ, ও চোখ অন্ধ। আরেক চোখে রিমিঝিমি দেখেন। কুড়ি বছর আগে প্রেমিকার খুনে কারাগারে বন্দী জীবন। তিনি কারাগার থেকে এখনও তো মুক্তি চান না; কিন্তু পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব তাঁকে বেরিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেন। স্বপ্ন দেখান। তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, আপনার বিষাদলিপ্ত বন্দীত্বের জীবন শেষ। নতুন করে বাঁচুন, আরও নানান মোটিভেশনাল কথাবার্তা।
অবশ্য মিথ্যে মামলায় কুড়ি বছর কারাবরণ করতে তাঁর কোনো অসুবিধে হয় নি। কিঞ্চিৎ মনখারাপও না। তিনি তো চেয়েছিলেন মৃত্যু অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। বিচারপতির বিরুদ্ধে উল্টো মামলা করা উচিত কিন্তু কীভাবে করবেন সেটাই ভাবছেন। পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব আবারও ডাকলেন, মাস্টার দার্কিলান সাহেব, আমাকে শোনতে পাচ্ছেন?
জি।
আপনাকে এতো পছন্দ করি কেন জানেন?
মাস্টার না-সূচক মাথা নাড়ালেন।
অফিসার হাসিমুখে বললেন, অনুমাননির্ভর বলুন দেখি।
আপনার মেয়ে রাজিয়ার প্রাইভেট টিচার ছিলাম। হয়তো একারণে।
অফিসার একটু সময় নিলেন। তারপর শক্ত গলায় বললেন, না-না। ঠিক সেকারণে নয়।
মাস্টার বললেন, ওঁ।
আপনার মধ্যে অদ্ভুত কিছু ব্যাপার আছে। তা কি আপনি জানেন?
মাস্টার উদাস গলায় বললেন, ওঁ।
আপনার কাছে কয়েকটা প্রশ্ন করবার ছিল। অনুমতি দিলে করতে পারি। ভালো কথা, এরপর কিন্তু সোজাসুজি বাড়ি চলে যাবেন। ঠিক আছে?
মাস্টার পুনরায় মাথা নেড়ে বললেন, ওঁ।
অফিসার একটা নিশ্বাস ফেললেন। তারপর মাস্টার সাহেবের দিকে তপ্ত চোখে তাকিয়ে বললেন, আপনি বারবার 'ওঁওঁ' করেছেন কেন? সুন্দরভাবে কি কথা বলতে পারেন না?
কী বলতে চান? বলুন। ক্ষীণ গলায় মাস্টার দার্কিলান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন। অফিসার জবাব না দিয়ে চাপা হাসি হাসলেন। তারপর প্রস্তাব সরূপ মাস্টার দার্কিলান সাহেবকে বললেন, কী খাবেন। চা না কফি?
ব্লাক।
ব্লাক-সিগারেট?
মাথা নেড়ে সায় দিলেন দার্কিলান। অতোটা বছর পর আবার সিগারেট খেতে পারবেন বলে আগে কখনও ভাবেন নি। সিগারেটের কথা শুনে তাঁর বিষণ্ণ চেহারাটা এখন বেশ আনন্দিত লাগছে৷ আনন্দের রঙটা কেমন? লাল। হলুদ। খয়েরি। যে রঙই হোক। তবে এতটুকু বলা যায় যে দিনের আলোয় সূর্য যেমন প্রকটিত তেমনি উজ্জ্বল আর অনুজ্জ্বল চেহারার ছাপে আনন্দ ও বেদনা উপলব্ধিত।
আনিস সিগারেট কিনতে বেরিয়ে এলো।
টেবিলের একপাশে মাস্টার দার্কিলান সাহেব; বিপরীত চেয়ারে হেলান দিয়ে পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব বসে আছেন। হাতে একটুকরো কাগজ। কোথায় থেকে শুরু করবেন তা অনিশ্চিত হলেও মাস্টার দার্কিলান সাহেব যে সবগুলো প্রশ্ন এড়িয়ে যাবেন, অন্তত এতটুকু সুনিশ্চিত অফিসার। তবুও ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়ে যাবেন বলে মনস্থির করেন। পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব কাগজ থেকে চোখ সারিয়ে নিতে নিতে বললেন, আপনি চেমিরেশকে চেনেন?
চিনলে কি আর না চিনলেই বা কি। এখন অবধি নিজেকেও পুরোপুরি চিনতে পারি নি। আর আপনি কোথাকার চেমিরেশ নিয়ে পড়ে আছেন।
কথাটা এড়িয়ে যাবেন না। সত্যি করে বলুন।
শুনুন অফিসার। জীবনে দুটো মিথ্যে বলেছি। একদিন মিথ্যাটাও অলৌকিক সত্যে রূপান্তরিত হবে। সেইদিন বেশি দূরে নয়। আশেপাশে কালো বিড়ালের মতো ঘুরঘুর করছে। আপনি কিছু কি বুঝলেন?
অফিসার একটা নিশ্বাস ফেললেন। তারপর টেবিলের দিকে খানিকটা ঝুঁকে এসে হতাশ গলায় বললেন, আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না।
সত্যি পারছেন না?
না। তা ছাড়া আপনি কথায় কথায় সত্য-মিথ্যা নিয়ে অদ্ভুত কথাবার্তা বলেন। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েও বলেছেন। তাহলে সত্যটা আমার কাছে প্রকাশ করুন।
মাস্টার কিছু বললেন না। অফিসার ভালোভাবে লক্ষ করলেন, মাস্টার দার্কিলান সাহেবের চোখ ক্রমশ লাল হচ্ছে। তিনি পাগলের মতো খিলখিল করে হাসছেন। হাসিটাও খুউব ভয়ংকর। হাসতে গেলেই তাঁর লম্বা দুটো দাঁত বের হয়ে আসে। এবারও দুটো বের হয়েছে। উসকোখুসকো লম্বা চুল আর মুখে অবিন্যস্ত সাদা দাঁড়ি-গোঁফ, দেখে ষাটোর্ধ বয়সী মনেহয় হলেও লোকটার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। অদৃশ্য কোনো সত্তার সাথে কথা বলার মতো আরও বেশকিছু অদ্ভুত আচরণ তাঁকে অতীতেও পুলিশ অফিসার করতে দেখেছেন। এখনও যে কার সাথে বিড়বিড়িয়ে কথা বললেন। কোনো গোপন সংবাদ দিতে আমরা যে দু-চারটে কথা বলি। তেমন কিছু। সংবাদ আদান-প্রদানের ব্যাপারটা নতুন না। তাঁকে প্রায়ই এমন করতে দেখা যায়। আগে দিনের তুলনায় অধিকাংশ সময় রাতে কথপোকথন করতে দেখা যেতো। ইদানীং দিবারাত্রির মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। অদৃশ্য সত্তার সাথে যখন-তখন আলাপচারিতায় লিপ্ত হন। যাইহোক।
এখানে একসাথে অনেকগুলো অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছে। এর মধ্যে একটা এরকম— মাস্টার পাগলের মতো হাসছেন। অথচ তাঁর অন্ধ-প্রায় চোখ থেকে কফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ছে। হাসি-কান্নার মিশ্রণ ব্যাপারটা অদ্ভুত। সম্ভবত ওটাকে বলা যায় Aesthetic সুখজল। সুখ থেকে উৎপন্ন হওয়া জলকে সুখজল বলে। আদৌও সুখজল বলে কিছু আছে? হয়তো আছে অথবা নেই। সুখজল নিয়ে গবেষণার বিষয়বস্তু আফজাল সাহেবের না। তাঁকে সাংবাদিক খুন তদন্ত নিয়ে এগোতে হবে। বাকি প্রশ্ন করবেন কিনা সিদ্ধান্তে পৌঁছতে না পেরে পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, মাস্টার সাহেব আপনি ঠিক আছেন?
মাস্টার জবাব না দিয়ে উদাস দৃষ্টিতে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছেন।
অফিসার বললেন, ওপরে তাকিয়ে আছেন কেন? আপনার কোনো অসুবিধে হলে বলতে পারেন নাকি আমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। যদি কথা বলতে না চান, তাহলে বলবেন না। এখন বাসায় চলে যেতে পারেন। চাইলে আমার বাসায়ও থেকে যেতে পারেন। আপনার ছাত্রী রাজিয়া খুব খুশি হবে। আমার মেয়ে বলেছে তার স্যারকে যেন বাসায় নিয়ে আসি। তাই বললাম আরকি।
মাস্টার কিছু বললেন না। তিনি ছাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। যেন কার সাথে বিড়বিড় করছেন।
অফিসার অবাক হয়ে বললেন, আপনি কার সাথে বিড়বিড় করে কথা বলছেন?
লিলি নিখোঁজ।
অফিসারকে তাক লাগিয়ে দিয়ে মাস্টার কথাটা বললেন। তারপর অফিসার মাস্টার সাহেবকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না। তাকে পেয়ে যাবেন৷
লিলি একটা অন্ধকার প্রাসাদে আছে।
অন্ধকার প্রাসাদের সংবাদ আপনি কীভাবে জানলেন? ভ্রঁ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন অফিসার।
মাস্টার দার্কিলান সাহেব এবার সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে এসে ফিসফিসিয়ে বললেন, আপনার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিরিসিনিকে জিজ্ঞেস করুন। ও একতুড়িতে সবকিছু বলে দেবে। ও আমার জন্য অনেকদূর থেকে সংবাদটা নিয়ে এসেছে।
হোয়াট! এখানে তো কেউ নেই।
মাস্টার ঝিম মেরে বসে রইলেন। কথা বললেন না। কুড়ি বছর ধরে তাঁর এমন ভৌতিক আচরণের সাথে পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব বেশ পরিচিত। কখনও লিলি আবার কখনও নিরিসিনি। অথচ তাঁর জীবনে লিলি কিংবা নিরিসিনির কোনো অস্তিত্ব নেই। জীবনে একের পর এক বিপর্যয় নেমে আসায় তিনি হয়তো অদ্ভুত। অবশ্য, এই ধরনের মানুষ অহর্নিশ বাস্তব-অবাস্তবে ঘূর্ণায়মান। বাস্তব জগতের চেয়ে কল্পনার জগতে নিজেকে আবিস্কার করতে এঁরা অধিক পছন্দ করেন। সে-নিয়মের পরিক্রমায় ফুটবলের মত মাস্টার দার্কিলান সাহেবও যথারীতি ঘুরছেন।
আনিসুর রহমান সিগারেটের প্যাকেট হাতে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে ভেতরে ঢুকলো। তার দিকে পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে বললেন, ডিউটি ফাঁকি দেওয়া ছাড়া, ঠিকমতো কোনো কাজ করতে পারিস না। সিগারেট কিনতে এতো সময় লাগে?
আনিস বলল, এই ব্রান্ডের সিগারেট কোথাও পাইনি স্যার।
হাতে ওটা কী?
সিগারেট। ডজনখানেক দোকানে তালাশের পর অবশেষে পেলাম।
ব্লাক নাকি অন্য কিছু?
ব্লাক।
দিয়াশলাই পেলি?
জি স্যার।
পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব হাত বাড়িয়ে সিগারেট আর দিয়াশলাই নিলেন। তাকে চোখ ইশারায় যেতে বললে সে বের হয়ে আসে। দরজার পাশে কানখাড়া করে দাঁড়ায়। আনিসুর রহমানের একাধিক বদঅভ্যেসের মধ্যে হয়তো এটাই অন্যতম। কোথাও গোপনীয়তার গন্ধ পেলেই কানখাড়া করে দাঁড়িয়ে থাকবে। তাতে ফায়দাও অনেক। বিনা পরিশ্রমে টাকার পাহাড় গড়তে পারার মতো অনেক সুযোগ সুবিধাও আছে। ইদানীং আফজাল সাহেব তাকে সন্দেহের চোখে দেখেন। আগে বিশ্বাস করতেন, এখন বিন্দুমাত্রও করেন কিনা কে জানে।
কয়েক-মিনিট পর মাস্টার দার্কিলান সাহেব ধীরেধীরে স্বাভাবিক হলেন। তারপর পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেবের দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, আপনার প্রশ্নোত্তর পর্বটা শেষ হয়েছে নাকি খামোখা এখানে বসিয়ে রাখবেন?
আচ্ছা বলুন দেখি, আপনার বিরুদ্ধে চেমিরেশের ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান কারণটা কী ছিল?
চেমিরেশ?
হ্যাঁ, চেমিরেশ। বিষাদায়ু উপন্যাসের লেখক।
তাঁর সঙ্গে মাত্র কয়েক ঘন্টার পরিচয়। সামান্য আলাপচারিতায় ভালো বন্ধুত্ব কিংবা শত্রু হওয়া বড়োই কঠিন।
আমার মনেহয় আপনি কিছু একটা লুকোনোর চেষ্টা করছেন।
মাস্টার ফিক করে হাসলেন। অফিসার মাস্টার দার্কিলান সাহেবের দিকে প্রখর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, একসুতো পরিমাণ কিছু বাদ দিবেন না। সবকিছু অভয়ে বলুন।
যা গুপ্ত তা কুড়ি বছর ধরেই হৃদয়ে সুপ্ত আছে। এতটুকু বলে মাস্টার খিকখিক করে হাসলেন।
অফিসার বললেন, আমাদের হাতে কিন্তু পর্যাপ্ত সময় নেই। আপনি অতীত নিয়ে লুকোচুরি খেলা বাদ দিয়ে সবকিছু খুলে বলুন। আর ভালো করে মনে রাখবেন, চেমিরেশকে পাকড়াও করতে আপনার গুপ্ত ইনফরমেশন 'সাংবাদিক খুন তদন্তে' বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। কুড়ি বছর আগে আপনার সাথে ঠিক কী ঘটেছিল তার পুঙ্খানুপুঙ্খ জানতে চাই।
মাস্টার বললেন, আমার অতীত আর বর্তমান দুটোই তো এক।
বলতে থাকুন আমি শুনছি।
অফিসার খুব আগ্রহ নিয়ে কানখাড়া করে বসে রইলেন।
মাস্টার মৃদু হাসলেন। তারপর বাঁকা চোখে আফজাল সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, অতো আগ্রহ দেখানোর কিছু নেই। আপনি কি ভুলে গেছেন আমি একজন খুনি?
আপনাকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছিল বলে আমার ধারণা।
মাস্টার তিরস্কার করে বললেন, ধারণা?
হুঁ। কেবল ধারণা বলছি না, নিরেট সত্যও বটে।
মাস্টার অফিসারের কথায় আপত্তি জানিয়ে বললেন, না। আমি খুনি। আমি নিজ হাতে আমার পছন্দের মানুষটাকে খুন করেছি। আমি থিহি সুলতানার খুনি।
মাস্টার সাহেবকে থামিয়ে অফিসার বললেন, আশ্চর্য! আপনার এই মিথ্যে স্বীকারোক্তির জন্য কুড়ি বছর কারাবরণ করেছেন। এখন অবশ্য কারাগার থেকে বেরিয়ে যাবেন। তবে যাবার আগে চেমিরেশ সম্পর্কে যথার্থ ইনফরমেশন দিয়ে তাঁকে আইনের আওতায় আনতে সাহায্য করুন। প্রশাসন অনেক আগেই চেমিরেশকে ধরতে পারতো যদি-না আপনি মিথ্যে স্বীকারোক্তি দিয়ে নিজেকে কাঠগড়ায় অপরাধী প্রমাণ করতেন।
মাস্টার চুপচাপ বসে রইলেন। কিছু বললেন না।
অপরদিকে অফিসার চিন্তিত গলায় বললেন, দেখুন মাস্টার। সদ্য ঘটে যাওয়া বিষাদায়ু উপন্যাস কেন্দ্রিক সাংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিক মিনার আহমেদ মার্ডার হওয়াতে চেমিরেশকে পাকড়াও করার আরেকটা সুযোগ করে দিয়েছে। যদি আপনি আন্তরিক হয়ে ঘটনা খোলাসা করেন, তাহলে তাঁকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করতে অনেক সুবিধে হবে। সেহেতু বিষাদায়ু উপন্যাস কেন্দ্রিক মার্ডারে আপনার নামটাও কাকতালীয়ভাবে ওঠে এসেছে। সেকারণে আপনার জবানবন্দি ইম্পর্টেন্ট বলে আমি মনে করছি।
মাস্টার নড়েচড়ে বসলেন। অফিসার বড়ো বড়ো নিশ্বাস ফেলে বললেন, আপনি কি চেমিরেশকে কোনো কারণে ভয় পাচ্ছেন অথবা এমন কিছু কি গোপন রয়েছে, যেকারণে আপনি নিজের ঘাড়ে সমস্ত অপরাধ অনায়াসে চাপিয়ে নিচ্ছেন। অথচ সাহস করে কিছুই বলতে পারছেন না।
এছাড়া আর কী কী মনে হয় আপনার? মাস্টার ভ্রঁ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন।
অফিসার বললেন, মনে তো অনেক কিছুই হয়। থিহি সুলতানার লাশটাও তো পাওয়া যায় নি। Without one finger. অবশ্য সেটা থিহি সুলতানার ছিল বলেই আপনি ফেঁসে গিয়েছিলেন।
মাস্টার দার্কিলান এবার রেগেমেগে বললেন, থিহি সুলতানার ঘাড় মটকে সামুদ্রিক হাঙরের মতো গিলে ফেলেছিলাম। তাই লাশটাও পাওয়া যায় নি, এখন কি বিশ্বাস হয়েছে?
খুনটা তো আপনি করেন নি। অন্য কেউ হয়তোবা করেছিল। সেটা বিচারপতিসহ অনেকেই জানতেন। একটা ভিডিয়ো ফুটেজের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে আপনাকে ফাঁসানো হয়েছে। ভিডিয়োটাও অভিনয়কৃত ছিল। সেদিন নিজেকে থিহি সুলতানার খুনি বলে স্বীকারোক্তি দিলেন কেন, বলুন?
মাস্টার দার্কিলান সাহেব কোনো জবাব দিলেন না। টেবিলের ওপর সিগারেট। হাত বাড়িয়ে দিয়াশলাই আর ব্লাক সিগারেট দখলে নিলেন। অতীতের দাবানলে পুড়তে পুড়তে ছাই না-হয়ে কীভাবে যে পাথর হলেন। তাই ভাবছেন। মাস্টার দার্কিলান সাহেব দুটো সিগারেট একত্রে জ্বালিয়ে দীর্ঘ টান দিতে লাগলেন। তাঁর সিগারেটে খাওয়ার কয়েকটি বিশেষত্ব আছে। এরমধ্যে একটি হল, তিনি যখনই সিগারেট খেতে বসেন তখন স্রেফ একটা না; একসাথে দুটো সিগারেট খান। আর সেটা কেবল ব্লাক সিগারেট। অন্য কোনো ব্রান্ড হলে নিসন্দেহে না। অবশ্য এর পেছনের কারণটাও খুব ইন্টারেস্টিং। সিগারেটের গল্পটা নাহয় পরেই বলা যাবে।
মাস্টার সিগারেট ফুঁকছেন। ব্লাক সিগারেট। অপরদিকে অফিসার সিগারেটের দিকে হা করে তাকিয়ে আছেন। দশেক মিনিটের মধ্যে পুরো সিগারেটের প্যাকেট শেষ। বিষয়টা বড়োই অদ্ভুত।
রাত এগারোটা। মাস্টার দার্কিলান সাহেব কারাগার থেকে বেরিয়ে পাঁচ ঘন্টা যাবত রাস্তার পাশে ভিখারির মতো জড়োসড়ো হয়ে বসে আছেন। হাতের আঙুল দিয়ে ছবি আঁকেন। খুব সুন্দর একটি ছবি। দেখে মানুষের মতো মনে হলেও ছবিটা মানুষের নয়। দু'মিনিট পরপর বিড়বিড়িয়ে কথা বলেন। কখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসেন। হাসিটা মোটেই মহানন্দের নয়; পোড়-খাওয়া জীবনের বিষাদ থেকে উৎসারিত। যেন কোনো অদৃশ্য সত্তা তাঁকে পরিচালনা করছে। ও নাচতে বললে তিনি নাচবেন। হাসতে বললে হাসবেন। ছবি আঁকতে বললে আঁকবেন। মাস্টার দার্কিলান সাহেব এরকমই হঠাৎ বদলে যান। বদলে যাওয়ার মুহূর্তে চোখ লাল হয়। একা-একা কথা বলেন। কথাগুলো অনুবাদ করলে অনেকটা এরকম—
বন্যপশুর গোঙানির শব্দে বলা হয়, মাস্টার দার্কিলান সাহেব, অন্ধকার প্রাসাদে আপনাকে স্বাগতম। হা। হা৷ হা।
অদৃশ্য সত্তার সাথে তাল মিলিয়ে মাস্টার দার্কিলান সাহেবও দাঁত বের করে পাগলের মতো হাসতে লাগলেন। লম্বা দুটো দাঁতের আঘাতে ঠোঁট ফেটে রক্ত বেরুচ্ছে। তবুও তিনি হাসছেন। তাঁর এমন রহস্যময় হাসির শব্দ শোনে চতুর্পাশে মানুষ জড়ো হওয়া শুরু করল। অবিশ্বাস্য ব্যাপার, প্রায় ঘন্টাখানেক হাসতে হাসতে মাস্টার দার্কিলান সাহেব বেহুঁশ হয়ে মাটিতে পড়ে যান। কারাগার থেকে অনতিদূর মানুষের হৈচৈ-চেঁচামেচি শোনে পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। সহজসরল মানুষটার এমন বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে তাঁর একটু মায়াই যেন হল।
আফজাল সাহেব জানতেন, মাস্টার দার্কিলান সাহেবের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। তাঁর আপনজন বলতে শয্যাশায়ী বুড়ো মা-বাবা আর একটিমাত্র আদুরের বোন ছিল। তাঁর নাম লায়লা। কারাগারে কয়েকমাস যেতে না যেতে একজন বৃদ্ধ চাচা খবর নিয়ে এলেন। কেন্দ্রীয় কারাগারে কথপোকথন।
এখানে কী চাই চাচা?
আমার ভাতিজারে দেখতে এলাম।
নামটা বলুন।
দার্কিলান। মাস্টার দার্কিলান।
আপনি তাঁর নিকটাত্মীয়?
না, গ্রামের মতলব চাচা। কতদিন হয় ভাতিজাকে দেখি না।
আপনি পরে আসেন। আজকে দেখা করতে পারবেন না।
মতলব চাচা রাগান্বিত হয়ে বললেন, দেখা করতে পারবো না মানে? অবশ্যই দেখা করে তারপর যাবো।
আরে চাচা। রাগ করছেন কেন?
রাগ তো করবই। ভাতিজার কাছে একটা সংবাদ নিয়ে এসেছি। খুব জরুরি সংবাদ।
মাস্টার সাহেবকে খবর পাঠানো হয়েছে। তিনি এখন কারো সাথে দেখা করতে চান না। আপনি চলে যান। আর ডিস্টার্ব করবেন না।
মতলব চাচা মনখারাপ করে চলে গেলেন৷ তিনি একটা মৃত্যুর সংবাদ নিয়ে এসেছিলেন। মাস্টার দার্কিলান সাহেবের ছোট বোন লায়লা। সে গতকাল স্বামীর পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে একটা-পর্যায় মারা যায়। সামান্য টাকার জন্য লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে লায়লাকে খুন করা হয়। মাস্টার দার্কিলান সাহেব খবরটা শোনে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। কোনো কথা বললেন না৷ লায়লার স্বামী প্রায় শশুরবাড়ি থেকে টাকা-পয়সা চাইতো। মাস্টার দার্কিলান সাহেব তাঁর একমাত্র বোন লায়লার সুখের জন্য আবদার পূরণের চেষ্টা করতেন। যদিও মাস্টার দার্কিলান সাহেব তাঁর বোন লায়লাকে সবসময় ভালো কোথাও বিয়ে দিতে চাইতেন কিন্তু দারিদ্রসীমার মারপ্যাঁচে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। পনেরো দিন পর আবারও মতলব চাচা আরেকটা সংবাদ নিয়ে এলেন। সেটাও ছিল মৃত্যুর। মাস্টার দার্কিলান সাহেবের বৃদ্ধ বাবা-মা অনাহারে অচিকিৎসায় মারা যান। মাস্টার দার্কিলান সাহেব সংবাদটা শোনামাত্র পাথরের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। কোনো কথা বললেন না। তারপর পাগলের মতো দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে চিৎকার করতে করতে কেন্দ্রীয় কারাগার মাথা তুললেন।
দোতলা বাড়ি। বিদেশি ডিজাইনের নিখুঁত কারুকার্যময় বাড়িটিতে পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব থাকেন। চারেক মাস আগে তাঁর কন্যা রাজিয়া আর সহধর্মিণী রুবিয়াকে ফ্রান্সে পাঠিয়েছেন। বলতে গেলে চমৎকার বাড়িটিতে এখন তিনি একা-একা বসবাস করছেন। যদিও বাবুর্চি কাহিল রান্নাবান্না করে চলে যায়। মাঝেমধ্যে আফজাল সাহেবের ভীষণ পীড়াপীড়িতে বাবুর্চি কাহিল দোতলার একটা ছোট্ট কামরায় থেকে যায়।
মাস্টার দার্কিলান এখনও আরাম করে তুলতুলে বিছানায় শুয়ে আছেন। লোকটা ভৌতিক হলেও কেন জানি একজন সাদামাটা নিরীহ মানুষ বলেই মনেহয়। রাস্তায় বেহুঁশ হয়ে পড়ে যাওয়ার পর পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব তাঁকে বাসায় নিয়ে এলেন। কোনো আন্তরিকতার কমতি দেখাননি বলে বাবুর্চি বেশ অবাকই হল। সে আগে কখনও আফজাল সাহেবকে এতো আদর আপ্যায়ন করতে দেখেনি। লোকটা বিশেষ কেউ হবেন বলে বাবুর্চি কাহিল ধরে নিল।
আফজাল সাহেব ডাকলেন, কাহিল। ও কাহিল।
জি স্যার।
আজ বাড়ি থেকে কোথাও বের হবি না।
কিন্তু আপনি—
কোনো কিন্তু-টিন্তু নেই। কাজকর্ম ঠিকঠাক মতো করবি। কোনোরকম ফাঁকিবাজি করিসনে। ঠিক আছে?
ওকে স্যার।
আরেকটা কথা।
বলুন।
মাস্টার দার্কিলান সাহেব ঘুম থেকে ওঠে গেলে পেটভরে খেতে দিবি। অনেকদিন হল লোকটা ঠিকমতো ভালোমন্দ কিছু খেতে পারেন নি। বেচারার জন্য আফসোস হয়।
আফজাল সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে কাহিল বলল, খেতে অসুবিধে কী?
তিনি কুড়ি বছর ধরে কারাগারে ছিলেন।
কেন?
থিহি-খুনের ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হয়ে। অবশ্য, সার্বিক ঘটনাপ্রবাহ অনুধাবন করে বলা যায়, লোকটা আসলেই নির্দোষ। একদম সাদাসিধা মানুষ।
তাহলে সাজা হল কেন?
গম্ভীর গলায় আফজাল সাহেব বললেন, এইখানে অর্থাৎ এই জগতে নির্দোষী দোষী। অসাধু সাধু। নিরপরাধীর কারাদণ্ড আর অপরাধী ক্ষমতাবলে গায়ে লিলুয়া-বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানোই তো সুন্দর।
কাহিল কিছু বলল না। জ্ঞানী মানুষের কথাবার্তা কেবল জ্ঞানীরা বিশ্লেষণ করতে পারে বলে তার ধারণা। সে তো সামান্য বাবুর্চি। সুতরাং আফজাল সাহেবের দামী কথার সঠিক মর্ম বোঝার শক্তিটুকুও তার নেই। কাহিল কানখাড়া করে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে আফজাল সাহেব নরম গলায় বললেন, মাস্টার দার্কিলান সাহেব ঘুম থেকে ওঠে ভৌতিক আচরণ করতে পারেন। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সাবধান থাকবি।
হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ে কাহিল।
তারপর ভয়ে-ভয়ে বলল, মাস্টার সাহেব কিছু ভাঙচুর করতে পারেন?
না, ভাঙচুর করবেন বলে মনেহয় না। করলেও আপত্তি নেই। মাস্টার দার্কিলান সাহেব শিক্ষক মানুষ। হয়তো সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ঠিক আছে?
জি।
আর হ্যাঁ, বিশেষ কোনো প্রয়োজন হলে টেলিফোন করবি।
জি স্যার।
হালকা নাস্তা করে আফজাল সাহেব বাসা থেকে বেরিয়ে এলেন। বাবুর্চি কাহিল পেছন থেকে উঁচু গলায় বলল, স্যার। কয়টার দিকে ফিরবেন?
রাত ন'টা। আর কিছু বলবি?
ইয়ে মানে—
কী আমতাআমতা করছিস। তাড়াতাড়ি বলে ফেল। আমার ভীষণ তাড়া আছে। কথাসাহিত্যিক চেমিরেশের বাসায় যেতে হবে। ইম্পর্ট্যান্ট একটা কাজ আছে।
বাবুর্চি কাহিল বলল, স্যার আজকে তো আমার ছুটিতে যাওয়ার কথা।
কয়েকদিন পর যাবি। অসুবিধে নেই তো?
যেতে পারলে ভালো হতো স্যার।
দুদিন পর যা। দেখতেই তো পারছিস। আমি একা মানুষ রান্নাবান্না করতে অসুবিধে হয়। তাছাড়া, মাস্টার দার্কিলান সাহেবকে বাসায় একা রাখা মোটেই ঠিক হবে না। বয়স্ক মানুষ না জানি কী করে বসেন।
জি।
অফিসার বললেন, মনখারাপ করলি?
জি-না স্যার। ছেলেটা অসুস্থ। ভালো ডাক্তার দেখাতে পারলে খুব ভালো হতো।
আচ্ছা ঠিক আছে। আগামীকাল যেতে পারিস। আরেকটা কথা।
বলুন।
তোর ছেলের চিকিৎসার খরচ-বাবদ কত আসতে পারে?
হিসেবে করি নি, স্যার।
নিশ্চিত হয়ে বলিস।
অফ কুট স্যার।
কী?
অফ কুট।
পুলিশ অফিসার আফজাল সাহেব হাসতে হাসতে বললেন, ওটা অফ কুট না রে পাগল। Of course. অব কোর্স বল।
কাহিল শুদ্ধরূপে পড়তে যেয়ে পুনরায় ভুল পড়ল। দুবার তিনবার চেষ্টা করেও শুদ্ধরূপে বলতে পারেনি দেখে আফজাল সাহেব একটা কাগজে 'Of course' শব্দের ইংরেজি বাংলা দুটোই লিখে দিলেন। তিনি জীপ নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে শব্দটা একশো বার পড়তে বললেন। কেবল আস্তে পড়লে চলবে না তাকে উচ্চস্বরে পড়তে হবে। সেজন্য কাহিল শব্দটা চিৎকার করতে করতে পড়ছে। প্রায় বাষট্টি বার পড়ে সামান্য বিরতি নিল। পুনরায় পড়া শুরু করতেই বাসায় ভৌতিক কিছু লক্ষ করে কাহিল। পুরো বাড়ি ফাঁকা অথচ দোতলা থেকে বিকট শব্দে কেউ কান্না করছে। মাস্টার দার্কিলান সাহেব হলে সে অতটা অবাক হতো না। তার ভয়ের একাধিক কারণ। মেয়েলি গলায় কেউ কবিতা পড়ে। আবার খিলখিল করে হাসে। কখনও নূপুরের শব্দ। কখনও ছাদের ওপর দৌড়াদৌড়ি। আগে কখনও এরকম হয় নি। মাস্টার দার্কিলান সাহেব বাড়িতে আসার পর থেকে বেশকিছু অদ্ভুত ব্যাপার সে উপলব্ধি করে। গতরাতেও ভালোমতো ঘুমায় নি। চোখবুঁজে অনেকবার চেষ্টা করেছে। তবুও না। আর চোখ বন্ধ করলেই সে দেখে, অন্ধকার প্রাসাদে দাঁড়িয়ে কেউ হাসছে। হাসিটা সাধারণ নয়, খুব ভয়ংকর। শয়তানের দাঁতের মতো দুটো লম্বা দাঁতের ভৌতিক হাসি। লোকটাকে দেখতে অবিকল মাস্টার দার্কিলান সাহেব মনে হলেও দুজনের মধ্যে অনেকটা তফাৎ আছে। পার্থক্য কোথায় স্মরণ নেই। ঘুম থেকে উঠে অনেকবার মনে করার চেষ্টা করেও সে ব্যর্থ হল। তারপর কাহিল সে রাতে আর ঘুমায় নি, বাতি জ্বালিয়ে সারারাত কোরআন তেলাওয়াত আর নফল নামাজ পড়ে কাটিয়ে দিল।
কাহিল দোতলার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করে। তার হাত-পা থরথর করে কাঁপছে। কপালে শিশিরবিন্দুর মতো পতনোন্মুখ ঘাম। কাহিল তার নিশ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ ছাড়া এখন আর দ্বিতীয় কোনো শব্দ শোনতে পেল না। দোতলার একটা কামরায় মাস্টার দার্কিলান সাহেব ঘুমিয়ে আছেন। সেটা চেক করা হয় নি দেখে কাহিল পুনরায় সেই রুমটার দিকে এগোয়। সেদিকটাতে যেতে মন কিছুতেই সায় দেয়নি, প্রবল অস্থির বোধ করায় সে ফিরে এলো। তাৎক্ষণিক পেছন থেকে কে জানি আওয়াজ দিল।
‘এই!—দাঁড়া।’
কাহিল ফিরে থাকায়। কেউ নেই। ভয় না পাওয়ার জন্য সে একটা কৌশল শিখে রেখেছে। সেটা কাজে লাগানো উচিত। নয়তো ভয়ংকর কিছু ঘটতেও পারে। বাবুর্চি কাহিল পশ্চিম দিকে মুখ ফিরিয়ে উচ্চস্বরে আযান দেয়। আযানের ধ্বনি তাকে মুক্তি দিতে পারে বলে সে বিশ্বাস করে। বিশ্বাস নিয়ে কিছু করলে সেটা খুব সহজেই পরিপূর্ণ হয়। কাহিলের বেলায়ও তাই হল। পবিত্র আযানের ধ্বনি তাকে ভেতর থেকে একজন সাহসী মানুষ বানিয়ে তুলল। কাহিল ভাবল— আর কোথাও বিপদে পড়লে প্রথমে ঠিক এই বুদ্ধিটা কাজে লাগাবে। তাতে কিছুটা হলেও ভয় কেটে যাবে। ময়মুরুব্বির মুখবুলি কাজে লাগে সে জানতো। তবে এতো তাড়াতাড়ি প্রমাণচিত্র পেয়ে যেতে পারে বলে সে আগে কখনও ভাবে নি।
সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে নিচতলায় নামতে গিয়ে কাহিল দেখতে পেল, ঘাড়-ত্যাড়া করে মাস্টার দার্কিলান সাহেবের মতো কেউ দাঁড়িয়ে আছে। লাল চোখ।
Tags:
Novel Darkilan
