অনন্য কাওছার
আসিফের শরীরটা বেশ খারাপ লাগছে। হাতপা ফুলেফেঁপে উঠেছে আবার। দেহের আকৃতি দিনেদিনে কেমন জানি হয়ে যাচ্ছে। সমস্ত শরীরজুড়ে নীলবর্ণী দাগের জন্য আসিফ কিছুটা আতঙ্কিত। হঠাৎ করে শরীরের অমূল পরিবর্তন; কোনোভাবেই ন্যাচারাল মনে হচ্ছে না। বিষ পানে সমস্ত শরীর যেরকম নীলবর্ণ ধারণ করে তেমনি আসিফের শিরা-উপশিরায় নীলবর্ণী দাগ। দিনের বেলা সে তুলনামূলক ভালো ছিল। অর্পিতাকে পড়ানো থেকে শুরু করে টুকিটাকি কাজও করেছে সে। যেমন, রুমের ভাঙা পালঙ্ক পরিবর্তন, ছাদে একটা ছোটখাটো টেবিল বসানো। টেবিলের ওপর রৌদ্রছায়ার জন্য একটা টিনের চালাও তৈরি করেছিল সে।
অর্থাৎ আসিফ ভোরবেলা স্বাভাবিক ছিল। সন্ধ্যা হতেই শরীরের এমন পরিবর্তন তাকে রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে। অর্পিতা যদি সত্যি বলে থাকে তাহলে এতোদিন সে কোথায় ছিল; বারবার মনে করার চেষ্টা করছে। লাইব্রেরিতে গিয়ে আসিফ জানতে পারে মনসুর মানিক ভোরবেলা বাইরে একটা কাজে গেছেন। তা নাহলে আসিফ জানতে পারতো এই একসপ্তাহ কি সত্যিই সে নিখোঁজ ছিল কিনা। যদিও আসিফ কাজের ভুয়া আয়েশাকে জিজ্ঞেস করেছে। উত্তরে আয়েশা বড়ো বড়ো চোখে বলেছে, জি ভাইজান। আপনি তো একসপ্তাহ নিখোঁজ ছিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, একসপ্তাহ পর আমাদের ছাদের ওপর জ্ঞানশূন্য অবস্থায় আপনাকে পাওয়া যায়।
তাদের ভাষ্যমতে, নিখোঁজ হওয়ার পর কাপড় শুকাতে তারা অনেকবার ছাদে উঠেছে কিন্তু আসিফকে সেখানে পড়ে থাকতে দেখেনি। এটা-কি আসলেই বিশ্বাসযোগ্য? আসিফ সারাদিন থেকে এইসব ছাইপাঁশ ভেবেই যাচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই হিসেব মিলাতে পারছে না। শরীরের নীলবর্ণী দাগ শীঘ্রই মুছে ফেলতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ নিতে গেলে বিরাট ঝামেলায় পড়তে হতে পারে তাঁর। কেউ কেউ ঢাকঢোল পিটিয়ে জানান দেবে "এইটা নীলবর্ণী ভাইরাস"। আসিফ সিদ্ধান্ত নিল, যাই হোক না কেন, কাউকে দেখানো যাবে না এই নীলবর্ণী দাগ। প্রথমদিকে দাগের পরিমাণ সামান্য ছিল বলে কেউ এতোটা লক্ষ করেনি।
আসিফ মনেমনে ভাবছে নীলপরি অঞ্চল থেকে আসা নীলবর্ণী তার্জিনরা কি তাঁকে এই দুর্দিনে সাহায্য করবে?
হ্যাঁ। অবশ্যই করবে। দরজার বাইরে থেকে আওয়াজ হলো। আসিফ হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনারা কারা?
আমরা তার্জিন সম্প্রদায়।
কেন এসেছেন?
আপনার সাহায্য লাগবে। তাই এসেছি।
আমার সাহায্য লাগবে কে বলল?
কেউ বলেনি।
তাহলে কীভাবে বুঝলেন আমার সাহায্য লাগবে?
আমরা আপনার সবকিছু জানি।
কীভাবে জানেন?
বললে আপনি বিশ্বাস করবেন না।
বিশ্বাস করব না কেন?
গতকাল বিশ্বাস করেননি তাই।
কী বিশ্বাস করিনি?
আপনি যে পঞ্চ তার্জিন সেটা বিশ্বাস করেননি।
আপনাদের কাছে কোনো প্রমাণ আছে?
প্রমাণ তো অবশ্যই আছে। জেনে রাখুন, তার্জিন সম্প্রদায় কখনও মিথ্যে বলে না।
আসিফ বলল, বিষয়টা ইন্টারেস্টিং।
এই শব্দের সাথে আমরা পরিচিত নই। আমাদের বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে?
কেন হচ্ছে?
এইটা হয়তো বাংলা শব্দ না। ঠিক বলেছি না?
হ্যাঁ ঠিক বলেছেন।
আসিফ জিজ্ঞেস করল, নীলপরি অঞ্চলে কি ইংরেজি ভাষার চর্চা হয় না?
না হয়না। তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি, আপনি নীলপরি অঞ্চল বিশ্বাস করছেন?
আসিফ মুচকি হেসে বলল, অবশ্যই। কিন্তু আমি যে পঞ্চ তার্জিন। এটা কোনোভাবেই বিশ্বাস হচ্ছে না।
ইতোমধ্যে বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন। ঠিক বলিনি?
আসিফ মাথা নেড়ে বলল, না বিশ্বাস হচ্ছে না।
দরজার বাইরে থেকে শাকু তার্জিন উচ্চস্বরে বললেন, আপনি মিথ্যে বলছেন। পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে চলাফেরা করতে করতে আপনিও মিথ্যে বলা শিখে গেছেন। মহামান্য পঞ্চ তার্জিন, আপনার মনে রাখা উচিত যে আপনি তার্জিন সম্প্রদায়ের সর্বশেষ উত্তরসূরি। তার্জিন সম্প্রদায় কখনও মিথ্যে বলে না।
আসিফ কিছুটা বিব্রত হলো। বলল, আমি যে পঞ্চ তার্জিন তার কোনো প্রমাণ আছে আপনাদের কাছে?
তাগু তার্জিন বললেন, আপনার চোখ শীঘ্রই নীলবর্ণ ধারণ করবে। ইতোমধ্যে সমস্ত শরীর নীলবর্ণী হয়ে গেছে। ঠিক বলিনি?
ঠিক বলেছেন।
শাকু তার্জিন জিজ্ঞেস করলেন, আর কিছু জানতে চান?
আসিফ কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, আমি কীভাবে নিখোঁজ হলাম। এবং একসপ্তাহ কোথায় ছিলাম?
শাকু তার্জিন কিছু বললেন না। তাগু বললেন, মহামান্য পঞ্চ। আপনি একসপ্তাহ নীলপরি অঞ্চলে ছিলেন। আপনার পিতা ভারুই তার্জিন আপনাকে দেখতে চেয়েছিলেন বলে আমরা আপনাকে তুলে নিয়ে যাই। আপনার মনে পড়ছে?
না, মনে পড়ছে না।
শাকু বললেন, আপনি কি 'নীল-আংটি' পরেছেন?
আসিফ মাথা নেড়ে বলল, না পরিনি।
তাগু তার্জিন আন্তরিক গলায় বললেন, নীল-আংটি পরে নিন। নীলপরি অঞ্চলের স্মৃতি মনে পড়বে। আপনার শরীরের নীলবর্ণী দাগও নিমিষেই মুছে যাবে।
আসিফের এবার বিশ্বাস হচ্ছে। বিশ্বাস হচ্ছে বলেই ওয়ারড্রবের দিকে সে এগোচ্ছে। নীল আংটি থেকে একরাশ নীলবর্ণী আলো চারিদিকে ছিটকে পড়ছে। মনে হচ্ছে বহির্জগতের দিকে পৌঁছে যাচ্ছে আসিফের নীলবর্ণী চোখ।
(পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই আসবে)
