রতন ‎— ছাইফুল আলম সেলিম



‎রতন
‎ছাইফুল আলম সেলিম
‎
‎রতনের মাসিক বেতন বিশ হাজার টাকা। বাবা-মা এবং এক বোন নিয়ে টানাপোড়েনের সংসার।
‎রতন বেশ কিছুদিন যাবৎ লক্ষ্য করছে, মাঝেমধ্যেই তার বাবার মন খারাপ থাকে। ছেলে বুঝতে পারে, হয়তো বাবার হাতে টাকা নেই। সারা জীবন বাবা নিজে কষ্ট করে সবার চাহিদা পূরণ করেছেন। সঞ্চয় বলতে তেমন কিছুই করেননি। আজ জীবনের পরন্ত বেলায় এসে বাবার ভরা হাত খালি হয়ে গেছে। ছেলের স্বল্প আয়ে সংসার চলে না। তাই হয়তো ওষুধের প্রয়োজন ছাড়া আর কোনো চাহিদার কথা কখনোই বলেন না।
‎ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে রতনের। ব্যস্ত দিন শেষে বাবা যখন ঘরে ফিরতেন, তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীর জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসতেন। মা সেই সব জিনিস হাসিমুখে গ্রহণ করতেন। মায়ের হাসিমুখ দেখে বাবাও খুশি হতেন। বাবার কি সেই সুখময় স্মৃতির কথা মনে পড়ে না? মায়ের মনই বা কেমন করে?
‎রতন আর ভাবতে পারে না। চোখে জল আসে। রতন সিদ্ধান্ত নেয়, যেভাবেই হোক সে বাবার হাতে কিছু টাকা তুলে দেবে। পাশাপাশি বউ এবং বোনের জন্যেও কিছু একটা করবে।
‎কোনো এক মাসের শেষে খুশিমনে রতন বাবার কাছে যায়। ত্রিশ হাজার টাকার একটি বান্ডিল বাবার হাতে দিয়ে বলে—
‎“এই নাও বাবা, মাকে নিয়ে খরচ করো।”
‎বাবা একগাল হেসে টাকাটা আলমারিতে রেখে দেন। বাবার সরল হাসি দেখে রতনের আনন্দ হয়।
‎সাত বছরের সংসার জীবন রতনের। ইতিমধ্যেই একটি ফুটফুটে সন্তান রতন-মালতীর ঘর আলোকিত করেছে। টানাটানির সংসার চালাতে গিয়ে অদ্যাবধি প্রিয় বউটাকে তেমন কিছুই দেওয়া হয়নি। কিন্তু আজ রতনের হাতে টাকা আছে। তাই সে বউকে সারপ্রাইজ দিতে দারুণ একটি উপহার কিনেছে। রতন নিশ্চিত, এই উপহার হাতে পেয়ে তার প্রিয়তমা বউয়ের আনন্দের সীমা থাকবে না। মালতীর অমন আনন্দ কল্পনা করে রতনের মনে শিহরণ জাগে।
‎ঘরে গিয়ে রতন ডাক দেয়—
‎“মালতী?”
‎“এই তো আমি।”
‎“সামনে এসো।”
‎মালতী হাসিমুখে রতনের সামনে এসে দাঁড়ায়।
‎“বল, ডাকছ কেন?”
‎“চোখ বন্ধ করো।”
‎“আহা! দেখো কী কাণ্ড! চোখ বন্ধ করব কেন?”
‎“আমি বলছি, বন্ধ করো।”
‎“এই যে করলাম।”
‎“এবার হাত পাতো।”
‎মালতী স্বামীর কথামতো চোখ বন্ধ করে হাত পাতে। রতন লুকিয়ে রাখা নেকলেসের বক্সটি বউয়ের হাতে দিয়ে বলে—
‎“এবার চোখ খোলো।”
‎মালতী অবাক। যেন দিনদুপুরে ভূত দেখছে!
‎“খুশি হয়েছ? বাইশ ক্যারেট। পুরো এক ভরি।”
‎রতনের আটপৌরে বউ চোখ মেলে সোনার নেকলেস দেখে পরম আনন্দে স্বামীকে জড়িয়ে ধরে। আবেগাপ্লুত রতন সহজ-সরল বউকে বাহুডোরে আবদ্ধ করে কপালে চুমু দেয়।
‎রতনের একমাত্র বোন মাধবী কলেজে পড়ে। অনেক দিন হলো, ওকে একটি বাটন মোবাইল কিনে দিয়েছিল রতন। কয়েক মাস যাবৎ ভাবছে, বোনকে একটি দামি মোবাইল কিনে দেবে। কিন্তু টাকা জোগাড় হয়নি। কিন্তু আজ রতনের পকেট গরম। তাই সে ছোট বোন মাধবীর জন্য একটি দামি মোবাইল কিনেছে।
‎নতুন চকচকে মোবাইলের বক্সটি হাতে নিয়ে বোনের দরজায় গিয়ে ডাক দেয় রতন।
‎“মাধবী?”
‎“জ্বি, ভাইয়া।”
‎“কাছে আয়।”
‎মাধবী মাথা নিচু করে ভাইয়ের কাছে এসে দাঁড়ায়।
‎“কেমন আছিস?”
‎“ভালো আছি, ভাইয়া।”
‎“তোর জন্য একটা উপহার আছে। এই নে, দাম বিশ হাজার টাকা।”
‎মাধবী বক্স দেখেই বুঝতে পারে, এটা অ্যান্ড্রয়েড ফোন। মনে হয় যেন স্বপ্ন দেখছে। নতুন মোবাইল পেয়ে আনন্দে চোখে জল এসে যায় মাধবীর। সে ভাইয়ের পা ছুঁয়ে সালাম করে। রতন মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। যাওয়ার সময় বলে—
‎“সবসময় মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকিস না যেন। মন দিয়ে লেখাপড়া করিস।”
‎পরিবারের সবার আনন্দ দেখে রতনও আনন্দেই ছিল। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের প্রথম প্রহরও পেরিয়ে গেছে। এখন রাত গভীর। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু রতনের ঘুম নেই। এক ভিন্ন ধরনের চিন্তা রতনকে গ্রাস করেছে।
‎রতন বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে। মালতী টের পায় না। বারান্দায় চেয়ারে বসে অন্ধকার আকাশের দিকে দৃষ্টি মেলে রতন। মুহূর্তেই সীমাহীন বিষণ্নতায় মন ছেয়ে যায়। আপন মনে ভাবে—
‎“বিশ হাজার টাকা রোজগারের ছাপোষা মানুষ আমি। সংসারের খরচ মিটিয়ে এক মাসে এতগুলো টাকা কোথায় পেলাম, কেউ তো একবার জিজ্ঞেসও করল না! বাবাও তো কিছু জানতে চাইলেন না!
‎বিবেকতাড়িত রতন ভাবে—
‎“বাবা যদি প্রশ্ন করতেন—
‎‘এই খোকা, তোর বেতন তো মাত্র বিশ হাজার টাকা। এত টাকা কোথায় পেলি? তুই কি কোনো অন্যায় পথে...?’
‎আমি মাঝপথে বাবাকে থামিয়ে দিয়ে বলতাম—
‎‘ছিঃ বাবা! কী বলছ এসব? তোমার ছেলে এমন কাজ করতে পারে? তুমি কি আমাকে এমন শিক্ষা দিয়েছ কোনোদিন?’
‎বাবা হয়তো আবার জিজ্ঞেস করতেন—
‎‘তাহলে কি ধারদেনা করেছিস?’
‎আমি জবাব দিতাম—
‎‘না বাবা, ধার করিনি।’
‎তখন হয়তো বাবা রেগে গিয়ে টাকাগুলো আমার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলতেন—
‎‘এই নে তোর টাকা। এ টাকার উৎস না জানা পর্যন্ত আমি একটি টাকাও স্পর্শ করব না।’”
‎বাবার সততায় সারা জীবন মুগ্ধ হয়েছে রতন। গর্বিত হয়েছে। কিন্তু এখন সেই বাবা কেমন যেন নিজের মধ্যে গুটিয়ে গেছেন। জাগতিক জীবন নিয়ে আগের মতো উপদেশ দেন না। তবুও এমন পরিস্থিতিতে পাহাড়সম বাবার সামনে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে রতন বলত—
‎“বাবা, টাকাটা নাও। এই টাকায় কোনো ভেজাল নেই। শতভাগ হালাল। এই টাকা থেকে তুমি পছন্দ করে মাকে কিছু কিনে দিও। তুমিও খরচ করো। তুমি সারা জীবন আমাদেরকে দুই হাত ভরে দিয়েছ। আর আমি তোমার হাতে একটি পয়সাও দিতে পারি না।
‎বিয়ের সময় তোমার বৌমাকে একটি নেকলেস দেওয়ার কথা ছিল। সাত বছর হয়ে গেল, আজও দিতে পারিনি। মেয়েটি একদিন মুখ ফুটে কিছু বলেনি।
‎মাধবীর বান্ধবীরা দামি মোবাইল চালায়। মেয়েটা কলেজে পড়ে। ওরও তো মন আছে, সাধ-আহ্লাদ আছে! ওকে একটি টাচ মোবাইল কিনে দেওয়া দরকার।
‎স্বল্প বেতনে সংসার চালাতে পারি না। তাই প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে এক লাখ টাকা লোন নিয়েছি, বাবা। এই টাকা আমার সঞ্চিত টাকা।”
‎রতনের এই কথা শুনে রাজ্জাক সাহেব হয়তো রেগে যেতেন। ছেলেকে বকা দিয়ে বলতেন—
‎“এমন কাজ কেন করলি তুই? আমরা কি তোর কাছে কিছু চেয়েছি? আমি তো তোর জন্য তেমন কিছু করতে পারিনি। ওই টাকাটাই তো তোর ভবিষ্যৎ।”
‎তারপর বাবার হাতে টাকাগুলো আবার গুঁজে দিয়ে চোখের জল গোপন করে দ্রুত চলে আসত রতন।
‎অন্তহীন ভাবনায় রতনের মন কিছুতেই শান্ত হয় না। সে লোনের ব্যাপারে নিজে থেকে আগেভাগে কিছুই বলেনি। হয়তো সবাই নিষেধ করবে—এই ভেবে। কিন্তু এই সংসারে এক লাখ টাকা অনেক টাকা! এতগুলো টাকা হঠাৎ করে সংসারে ঢুকে গেল। মাধবীর কথা না হয় বাদ গেল, তাই বলে বাবা কিংবা মালতী—কেউ কিছুই জিজ্ঞেস করবে না! অন্তত বাবার ক্ষেত্রে তো এমন হওয়ার কথা নয়!
‎নাকি বাবার অন্ধ বিশ্বাস—আমার ছেলে কখনোই নীতিগর্হিত কোনো কাজ করতে পারে না! এমন বিশ্বাস থাকতেই পারে। তথাপিও অসামঞ্জস্যতা দেখা দিলে পরিবারের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা দরকার।
‎রাতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রতনের চিন্তা গভীর থেকে গভীরতর হয়। চিন্তার নানান রকম শেকড়-বাকড় গজায়। রতন ভাবতে থাকে—
‎ঘরে ঘরে প্রতিটি রোজগারি মানুষের জবাবদিহিতা থাকা প্রয়োজন। এই জবাবদিহিতা নেই বলেই হয়তো দেশে এত চোর-বাটপার তৈরি হয়েছে এবং আশ্রয়-প্রশ্রয় পাচ্ছে। সমাজের এহেন খারাপ পরিস্থিতির জন্য এটাও একটা মূল কারণ।
‎সবাই জানে, মেয়েরা সাধারণত পুরুষের তুলনায় অধিকতর সৎ হয়। তাই এই জবাবদিহিতা সবচেয়ে বেশি নিতে পারে ঘরের বউ। কারণ তারাই স্বামীর রোজগারের হিসাব সবচেয়ে ভালো জানে। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যায় না।
‎প্রতিটি অসৎ মানুষের কাড়ি কাড়ি টাকায় ঘরে ঘরে চলছে আনন্দ-উৎসব। কেউ লজ্জিতও হচ্ছে না, কেউ জিজ্ঞেসও করছে না।
‎“আজ যদি বাবা প্রশ্ন করতেন—
‎‘এই টাকা তুই কোথায় পেলি? এই টাকার উৎস হালাল না হলে আমি মরে গেলেও স্পর্শ করব না।’
‎আজ যদি মালতী প্রশ্ন করত—
‎‘তুমি এই নেকলেসের টাকা কোথায় পেলে? যদি অবৈধ হয়, তাহলে এই গহনা আমি কখনো ছুঁয়েও দেখব না।’
‎আজ যদি মাধবী জানতে চাইত—
‎‘ভাইয়া, এতগুলো টাকা তুমি কোথায় পেলে?’
‎তাহলে রতন বেশি আনন্দিত হতো।
‎বুঝতে পারত, অন্তত একটি জায়গায় পরিবারে সবাই অতন্দ্র প্রহরীর মতো এক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিবারে আর যাই হোক, অসৎ মানুষের জায়গা নেই।
‎রতন আপাদমস্তক সৎ মানুষ। তবুও সংসারে হঠাৎ এক লাখ টাকা জোগানের জবাব দিতে চায়। এই জন্য দিতে চায় যে, সংসারের কেউ না কেউ হক-হালালের ক্ষেত্রে, নীতি-আদর্শের ক্ষেত্রে সচেতন থাকুক। কিন্তু এই জবাবদিহিতার বৈকল্যে ঘরে ঘরে অসৎ মানুষেরা তাদের নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলেছে। পরিবারের কেউ এই পাপ থেকে দায়মুক্ত হতে পারে না।
‎রতনের অশান্ত মনের ভাবনা থামে না। এর কোনো সমাধানও খুঁজে পায় না সে। নিজের পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে রতনের চিন্তা বিস্তৃত হয়। ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ রাতের ঘন অন্ধকার ফ্যাকাশে হতে থাকে। একসময় ক্লান্ত-শ্রান্ত-বিধ্বস্ত রতন চেয়ারে হেলান দিয়ে বারান্দায় ঘুমিয়ে পড়ে।
Previous Post Next Post