‘অচিন পথে রাত্রি হাঁটে’ এক বিবাগী আত্মার আত্মকথন —তৈমুর খান



‘অচিন পথে রাত্রি হাঁটে’ এক বিবাগী আত্মার আত্মকথন
 —তৈমুর খান 

নিউইয়র্ক প্রবাসী বাংলাদেশি কবি দেওয়ান নাসের রাজার "অচিন পথে রাত্রি হাঁটে" (নভেম্বর ২০২৫) কাব্যগ্রন্থটি প্রবাস জীবনের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন, জন্মভূমির প্রতি তীব্র নস্টালজিয়া এবং বৈশ্বিক ও সামাজিক অস্থিরতার এক চমৎকার শৈল্পিক দলিল। 
​কাব্যগ্রন্থের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে নিউইয়র্কের মতো এক যান্ত্রিক মেগাসিটিতে কবির যাপিত জীবনের একাকিত্ব। "দূরে চলে যাব", "আমারে কেউ চিনল না" কিংবা "আমার কেউ নেই" কবিতাগুলোতে এই বিচ্ছিন্নতা প্রকট। কবি যখন লেখেন—“আমি থাকব হয়তোবা কোনও বেজমেন্টে / হিটারবিহীন বিদ্যুৎ ঘর অন্ধকারময়” তখন তা কেবল ভৌগোলিক দূরত্ব নয়, বরং প্রবাসীদের আত্মিক একাকিত্বের এক নগ্ন বাস্তবতাকে সামনে আনে।

​কবি নিউইয়র্কের রাস্তায় হাঁটলেও তাঁর অবচেতনে সারাক্ষণ বয়ে চলে বাংলাদেশের নদী, প্রকৃতি ও শৈশব। কবিতাগুলোতে বারবার ফিরে এসেছে সুরমা নদী, আম-কাঁঠালের বাগান, শিউলি ফুল, বর্ষা এবং জোনাকির আলো। "চলো দূরবর্তী গ্রামে যাই", "তুমি এখন বাংলাদেশে" কিংবা "বকুলের গন্ধমাখা পথে" কবিতাগুলো প্রমাণ করে যে, কবির শিকড় আজও দেশের মাটিতেই প্রোথিত। প্রবাসের কৃত্রিম জাঁকজমকের চেয়ে দেশের কাদা-মাটির স্পর্শই তাঁর কাছে বেশি কাম্য।

​দেওয়ান নাসের রাজা কেবল রোমান্টিক বা নস্টালজিক কবি নন; তিনি সমাজ ও বিশ্বরাজনীতি নিয়ে সমানভাবে সচেতন। "প্লান করা হল", “প্রতিকূল এসময়" এবং "কেন ফোটে কেয়া"  এই ঘরানার কবিতাগুলোতে বৈশ্বিক নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে "প্লান করা হল" কবিতায় ফিলিস্তিন বা সমসাময়িক যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের অবিকল ‘নেতানিয়াহুর মুখ’ কিংবা ‘হায়েনার মতো হিংস্র নরপিশাচ’-এর রূপক ব্যবহার করে কবি তাঁর যুদ্ধবিরোধী ও মানবিক অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।

​কাব্যগ্রন্থে প্রেমের এক বিচিত্র অবয়ব দেখা যায়। এখানে প্রেম কখনো উদাসীন ("তখন আমার কাব্য করা শিকেয় তোলা"), কখনো দূরত্বে ভরা ("দূরত্ব"), আবার কখনো অনুচ্চারিত কান্নায় ভেজা ("অস্ফুট প্রেমের কাব্য")। "যদি অন্য হাত ধরতাম" কবিতায় জীবনের বিকল্প পথগুলোর প্রতি এক ধরনের মৃদু আক্ষেপ ও দার্শনিক জিজ্ঞাসা খেলা করে।

​"অচিন পথে রাত্রি হাঁটে" কাব্যগ্রন্থটি বিশ্লেষণ করলে কবির তিনটি প্রধান জীবনদর্শন উন্মোচিত হয়:
​১. দ্বৈতসত্তা বা ‘হাইব্রিড আইডেন্টিটি’র দর্শন:
​কবি একই সাথে দুটি ভিন্ন গোলার্ধে বাস করেন। তাঁর শরীর নিউইয়র্কে (যা কবিতার নিচে লেখা স্থান ও তারিখ যেমন—'নিউইয়র্ক, ২০২৫' দ্বারা প্রমাণিত), কিন্তু মন পড়ে আছে বাংলায়। এই দুইয়ের মধ্যকার যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, তাকে কবি কোনো নেতিবাচক রূপ না দিয়ে বরং কাব্যিক আত্মপ্রকাশের মাধ্যম বানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, মানুষের ভৌগোলিক অবয়ব বদলে গেলেও তার আত্মিক অবয়ব বা শিকড় কখনো মরে যায় না।

​২. প্রকৃতির মাঝে আশ্রয় ও নিরাময়:
​কবির দর্শনে প্রকৃতি হলো মানুষের সমস্ত যন্ত্রণার উপশমকারী। যখনই তিনি প্রবাসের যান্ত্রিকতায় ক্লান্ত হন, তখনই তিনি চাঁদের আলো, মেঘের আড়াল কিংবা বকের চোখের শোকে নিজের দুঃখকে বিলীন করে দেন। "দিঘির পানি কাঁপছে দেখো" বা "মেঘের দেশের চুল"-এর মতো রূপকে প্রকৃতি ও নারীসত্তা কবির কাছে পরম আশ্রয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

​৩. নিরবচ্ছিন্ন আশাবাদ ও মানবিকতার জয়গান:
​চারপাশে বৈরিতা, যুদ্ধ এবং ব্যক্তিগত বিষাদ থাকা সত্ত্বেও কবি শেষ পর্যন্ত সুদিনের প্রত্যাশা করেন। "দমকা হাওয়ায় পাতা ঝরে যায়" কবিতায় যখন তিনি লেখেন—“আকাশ হবে জানি তারায় ঝলমল / বহুদিন পর—” তখন তা মানুষের অপরাজেয় শক্তির প্রতি তাঁর গভীর বিশ্বাসকে ফুটিয়ে তোলে। ধ্বংসের ভেতরেও তিনি 'শ্যামল পৃথিবীর স্বপ্ন' দেখেন।

​ শৈল্পিক বিচারে এই কাব্যে কবি অত্যন্ত সহজ, সাবলীল অথচ চিত্রকল্পময় ভাষা ব্যবহার করেছেন। গদ্যকবিতার আবহে আধুনিক রূপক ও প্রতীকের ব্যবহার কবিতাগুলোকে ভীষণ Scannable এবং সহজে হৃদয়ঙ্গম করার মতো করে তুলেছে।
প্রায় প্রতিটি কবিতার শেষে "নিউইয়র্ক" এবং সাথে নির্দিষ্ট তারিখ (২০২৪-২০২৬-এর বিভিন্ন সময়) উল্লেখ থাকায় এটি কবির একটি জীবন্ত ডায়েরি বা ক্রনিকল হিসেবে রূপ নিয়েছে, যা তাঁর প্রবাস জীবনের বিবর্তনকে ধারণ করে।

​দেওয়ান নাসের রাজার "অচিন পথে রাত্রি হাঁটে" মূলত এক বিবাগী আত্মার আত্মকথন। এই রাত্রি যেমন প্রবাসের দীর্ঘ ও একাকী রাতের প্রতীক, তেমনি 'অচিন পথ' হলো জীবনের অজানা গন্তব্যের রূপক—যে পথে হাঁটতে হাঁটতে কবি ক্রমাগত খুঁজে চলেছেন তাঁর স্বদেশ, প্রেম এবং শাশ্বত মানবতাকে।

অচিন পথে রাত্রি হাঁটে : দেওয়ান নাশের রাজা নাগরী প্রকাশন, বারুতখানা, সিলেট-৩১০০, 
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
মূল্য ২৮০ টাকা।
Previous Post Next Post