উভয় বাঙলায় প্রতিষ্ঠিত ভাগ্যবান কবি যারা বিকাশমান সময় এবং সময়ের আগামী নির্বিরোধ কণ্ঠস্বর, ভবিষ্যত পাঠকের মস্তিষ্কে হৃদয়ঙ্গম করে আত্মপ্রকাশ করেন, তাদের মতোই আছিরগঞ্জের কবি অনন্য কাওছার। মাত্র কয়েক বছরে তিনি অতিক্রম করেছেন দীর্ঘপথ। প্রযুক্তির সুকল্যাণে জানার সুবিধা সহজলভ্য। সুতরাং আগেকার যাবতীয় সৃজনশীলতা ধরাছোঁয়ার ভেতরে। কবি অনন্য কাওছারের পাঠ্যাভাস চমৎকার এবং বাঙলা সাহিত্যের মেধাবী ছাত্র তিনি।
অতিদ্রুত লাইমলাইটে আসছে তার অনবদ্য কবিতার বই “নিষিদ্ধ রেলিংয়ে সন্ন্যাস” সীমাবদ্ধতার সূত্রের বাইরে যাদের অবাধ বিচরণ, কাল থেকে কালে, সময় থেকে সময়ে পৌঁছার দুর্বার মনোবাসনা তাদের দলেরই এক নব্য উচ্চারিত সম্ভাবনাময় কবি তিনি। আমার সম্পাদিত ‘নির্বাচিত’ লিটল ম্যাগাজিনে প্রথম তার কবিতা প্রকাশিত হয়। আমি ছাড়া আছিরগঞ্জের অন্য প্রতিভারা যথার্থ সম্মান এবং সহযোগিতা করার বদলে দেখান সন্দেহের মূর্খ চোখ। অনেকে কবি হিসেবে মানতেও রাজি হননি। পথিকৃৎ-১ লিটল ম্যাগাজিনে নিজেকে খুলে ধরার চ্যালেঞ্জিং কাজটি আমি করি বিদ্রোহী চোখে। পরবর্তীতে প্রায় প্রতিটি ম্যাগাজিনে অনন্য কাওছার দেখান তাঁর ট্যালেন্ট।
আমি নবীনদের ওঠে আসার পেছনে সর্বদা মানবিক। এটা এখন পরীক্ষিত। কানাডা প্রবাসী একজন কবিকে আমি ১৭ বছর আমার অভিজ্ঞতার বাহ্যিক অবাহ্যিক বাস্তব রূপ দেখাতে বদ্ধপরিকর ছিলাম। অনন্য কাওছার প্রায় প্রতিটি পত্রিকায় নিজের কবিতা প্রকাশিত হবার সুখ অনুভব করেন। অন্যদের ভাগ্যে যা ঘটেনি। আমি তাকে মন থেকে ভালোবেসে পরিচর্যা করেছি। তিনি তা প্রমাণ করে দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। অনন্য কাওছারের উঠে আসার গল্প বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। তিনিই তার কোনো না কোনো সাক্ষাৎকারে বলবেন তার তিক্ত অভিজ্ঞতা ও বৈপ্লবিক চেতনার আখ্যান।
চমৎকার প্রচ্ছদে মলাটবন্দী হচ্ছে তার যাবতীয় অভিজ্ঞতা, বর্তমান পর্যন্ত আলো অন্ধকার, অভিজ্ঞান, অভিজ্ঞতা, ছন্দ, রস, উৎক্ষেপণ, রূপক, উপমা, ইত্যাদি প্রতীকী সংবিৎ, সংবেদনা। কবি অনন্য কাওছার আছিরগঞ্জের কবি বলে উল্লেখ করলে অবিচার করা হবে। তিনি বাঙলা ভাষার একজন চৌকস মেধাবী কবি। তার অন্তর্লোকে বাস করছেন ঘুমন্ত একজন দার্শনিক। মনোযোগ সহকারে কাব্য পাঠ করলেই যে কোনো ট্যালেন্টার বুঝতে সক্ষম হবেন আমি কী বলতে চাচ্ছি।
“নিষিদ্ধ রেলিংয়ে সন্ন্যাস” কবিতার বইটি বোদ্ধা মহলে আলোচিত হবে সময়ে সময়ে। ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে এটি পৌঁছে দিচ্ছে উত্তর-আধুনিক কাব্যিক দর্শন যা বুঝতে অনেকের সময় লাগবে।
প্রথম কবিতা “নিসর্গজ ভাষণ” মাতৃভূমির প্রতি কবির ভালোবাসা ও আধুনিক চেতনার প্রকৃতি নির্ভর ফোকাস যা অভিভূত করে। স্বদেশের মাটি, ঘাসের ঘ্রাণ, প্রাণবন্ত মানুষের সহযাত্রী হবার উন্মেষ উচ্চারিত। নদী, ফুল, পাখি, ঘাস, পাতার পল্লবিত সুঘ্রাণ কবিকে হিপোটাইটিসের মতো মুগ্ধ করে রেখেছে।
“অস্বীকৃতি সক্রেটিস” কবিতা বা “সুররিয়ালিজম” বা “নীরব বিপ্লব” একটি ভিন্ন ভিন্ন উপলব্ধির সম্মুখে কবিকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে যেমন রক্তাক্ত করে হৃদয়, ঠিক তেমনি বিদ্রোহী উচ্চারণে প্রলুব্ধ করে। বয়সের সীমায় কবিকে বিচার করা মূর্খতা। তাই নয়? কবিদের কোনো দশকও নেই। কবি চিরকালীন যে কোনো প্রকৃত কবির ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য। কবিতার কাল বিচার না করে তার কলমে উচ্চারিত উপলব্ধির সার্থকতা বিচার করা উত্তম।
“হেলেনা আমার” “হেলেনার জন্য দ্বিতীয় কবিতা, তৃতীয় কবিতা” তার মস্তিষ্কের মানবিক সংবেদনা, হাহাকার, সৃজনশীলতা ইত্যাদি এমনভাবে প্রমূর্ত যার সারসংক্ষেপও সম্ভব হচ্ছে না লেখার মেদ বেড়ে যাবে ভেবে। “যে দার্শনিক কবিতায় কবি” অথবা “আমি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করছি” কবিতায় আমি দেখতে পাই বাঙলার সীমানা প্রাচীর ডিঙানোর এক অভূতপূর্ব ধ্রুপদি যুদ্ধ যা তাকে এনে দেবে ভবিষ্যতে কাঙ্খিত খ্যাতি।
আপাদমস্তক কবিমানস লক্ষ্য করি আমি অনন্য কাওছারের মধ্যে। নিয়তির মারপ্যাচ না থাকলে তিনি উতরে যাবেন অভিনব অনন্য উচ্চতায়। নির্মলেন্দু গুন, শামসুর রাহমান, মহাদেব শাহা, আল মাহমুদ এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবিদের পাশে অনন্য কাওছার নামটিও একদিন উচ্চারিত হবে এটা আমার মৌলিক ধারণা।
অনন্য কাওছার পোড়খাওয়া বিদগ্ধ এক কবি প্রতিভা। অভাবের বিষাক্ত ছোবল আমার মতো তাকেও রক্তাক্ত করেছে অহর্নিশ। তবুও থেমে নেই শিল্পচর্চার যুদ্ধ। প্রিয় পাঠক, “নিষিদ্ধ রেলিংয়ে সন্ন্যাস” কাব্যগ্রন্থটি এই বাঙলার বহুরূপী উপলব্ধির প্রামাণ্য দলিল। অনন্য কাওছারের প্রতি শুভকামনা।
রচনা: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাত ১১ টা ৫০ মিনিট।
এস এম সেবুল, কবি ও সাহিত্যিক
দেবারাই, আছিরগঞ্জ, সিলেট।
Tags:
গ্রন্থালোচনা
