বাংলা সাহিত্যে কুরবানির ঈদ: ত্যাগ, মানবতা ও সাম্যের শিল্পরূপ — ইফতেখার রবিন



বাংলা সাহিত্যে কুরবানির ঈদ: ত্যাগ, মানবতা ও সাম্যের শিল্পরূপ 
ইফতেখার রবিন 

মানবসভ্যতার ইতিহাসে ধর্মীয় উৎসব শুধু আনন্দ-উচ্ছ্বাসের উপলক্ষ নয়, বরং মানুষের আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ ও মানবিক চেতনার গভীরতম আহ্বান। মুসলিম সমাজে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা এই দুই উৎসব সেই ঐশ্বরিক আহ্বানেরই উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ। বিশেষত ঈদুল আজহা কেবল কুরবানির আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়; এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য নিহিত রয়েছে আত্মসমর্পণ, ত্যাগ, সহমর্মিতা ও মহান আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যে। হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর অবিস্মরণীয় ত্যাগগাথা যুগে যুগে মুসলিম হৃদয়ে যে আত্মিক আলো জ্বালিয়েছে, বাংলা সাহিত্যও সেই আলোকধারায় সিক্ত হয়েছে নানাভাবে।

বাংলা সাহিত্যের দীর্ঘ অভিযাত্রায় ঈদুল আজহা কখনো ধর্মীয় চেতনার প্রতীক, কখনো সামাজিক সাম্যের আহ্বান, আবার কখনো রাজনৈতিক মুক্তি ও মানবিক মূল্যবোধের রূপক হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। মধ্যযুগীয় কাব্য থেকে আধুনিক কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প ও স্মৃতিকথা—সবখানেই কুরবানির ঈদ ত্যাগের মহিমা ও মানবতার বাণী নিয়ে এক অনিবার্য সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। বাংলা সাহিত্যে ঈদুল আজহার এই বহুমাত্রিক রূপায়ণ কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবের ইতিহাস নয়, বরং বাঙালি মুসলমানের সমাজ-সংস্কৃতি, চেতনা ও আত্মপরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

মুসলিম সমাজে ঈদ উৎসব দুটি-ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। ইসলামি অনুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ঈদ মুসলিম উম্মাহকে ত্যাগে, মানবতায় ও মনুষ্যত্বে জাগ্রত হওয়ার ঐশ্বরিক প্রেরণায় উদ্দীপিত করে। মহান আল্লাহ প্রিয় বান্দাকে তার মহিমার পবিত্র প্রভায় রাঙিয়ে নিতেই এ উৎসব প্রবর্তিত করেছেন। ঈদুল আজহা মূলত আরবি বাক্যাংশ। অর্থ ত্যাগের উৎসব। এ উৎসবের মূল প্রতিপাদ্য হলো ত্যাগ করা। প্রিয় বস্তুকে আল্লাহর রাহে কুরবান করার এ দীক্ষা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর মাধ্যমে দুনিয়ায় প্রচলিত হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশীয় উৎসব থেকে ঈদ উৎসব ব্যতিক্রম তার আধ্যাত্ম-চেতনার প্রগাঢ় সমর্পণে। নিজেকে মহিমান্বিত করার ব্যাকুল বাসনায় চিন্তাশীল মানুষ তাই সৃষ্টির প্রবাহে সদা থাকেন উদ্বেল।

ঈদকে কেন্দ্র করে কবি-সাহিত্যিকরা বাংলা সাহিত্য ভুবনকে করেছেন সৃষ্টির আলোয় প্লাবিত। ইতিহাসের খেরো পাতায় চোখ দিলে বাংলা সাহিত্যের আদি যুগে এ সম্পর্কে কোনো তথ্য মেলে না। কিন্তু মধ্যযুগে ঈদুল আজহার উপস্থিতি মিলে। সে যুগে কুরবানি উৎসব সরাসরি কাব্যের বিষয়বস্তু হিসাবে উত্থাপিত হয়নি, কাহিনি প্রস্বরিত হয়েছে ত্যাগের চেতনায়। পনের শতকের কবি সৈয়দ সুলতান (১৫৫০-১৬৪৮) রচিত নবীবংশ কাব্যটি ঈদ সম্পর্কিত প্রথম রচনা। এ কাব্য কাহিনিতে হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তার পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর ত্যাগ রেখায়িত হয়েছে। কাহিনির ভেতর ঈদুল আজহার পটভূমির প্রেক্ষাপটে কুরবানি প্রথার উৎপত্তি বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়া কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তার চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে ঈদুল আজহার ধারণা পরোক্ষভাবে চিত্রিত করেছেন।

ঊনবিংশ শতাব্দী ছিল ইংরেজ শাসনের প্রতাপকাল। ভেদ-নীতির কৌশলে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের সম্পর্ক ছিল দা-কুমড়া। ফলে সামান্য অজুহাতে বঙ্গ অঞ্চলের মানুষ কুরবানির পশু জবাইকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে থাকে। সামাজিক বিরোধ চরম আকার নিলে হিন্দু সমাজ গো-রক্ষায় মরিয়া হয়ে ওঠে। হিন্দুদের বিরোধিতার মুখে মুসলমানদের কুরবানি পালনে প্রতিকূল প্রতিবেশ সৃষ্টি হয়। সামাজিক এ অবক্ষয়ের ওপর ১৮৮৯ সালে বাঙালি মুসলিম সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন রচনা করেন গো জীবন। প্রবন্ধে লেখক গো-হত্যার বিপক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে তার যুক্তি তুলে ধরেন। গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের বাধার আশঙ্কা থেকে এ লেখার প্রতিক্রিয়ায় একই বছরে রচিত হয় গো কাণ্ড। গ্রন্থটি লেখেন মৌলভী নঈম উদ্দিন (১৮৩২-১৯০৭)।

বিষয়টির নেতিবাচকতা আদালত পর্যন্ত গড়ালে মুসলিম স্কলারদের মধ্যে ব্যাপক বোঝাপড়া শুরু হয়। ১৮৯০ সালে রিয়াজ উদ্দিন আহমদ মাশহাদী (১৮৫২-১৯১৮) অগ্নিকুক্কুট নামক একটি প্রবন্ধ পুস্তিকা রচনা করেন। এ গ্রন্থে তিনি যৌক্তিক, বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় দলিলসহ গরু কুরবানির পক্ষে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেন। সমসাময়িক ‘সুধাকর’ পত্রিকায় এ লেখার তাৎপর্যের ওপর একটি ইতিবাচক রিভিউ প্রকাশিত হয়। বাস্তবতা হচ্ছে, কুরবানির পক্ষ-বিপক্ষের মনোভাব প্রসারিত করতে সে সময়ে রচিত এ সাহিত্যকর্মগুলো ধর্মীয় অধিকার রক্ষার দলিল হয়ে ওঠে। বিশ শতক থেকে মূলত ঈদ উৎসবকেন্দ্রিক যথার্থ সাহিত্যচর্চার উন্মেষ ঘটে। এ শতকের প্রথম দশকে বাঙালি মুসলমানদের নিজস্ব উৎসবভিত্তিক সংস্কৃত সাহিত্য রচনার প্রবণতা বেশ গতিশীল হয়ে ওঠে।

১৯০০ সালের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব সৈয়দ নবাব আলী চৌধুরী (১৮৬৩-১৯২৯) ঈদুল আযহা নামক একটি স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ রচনা করেন। এ গ্রন্থে লেখক নিজে এলাকায় ঈদের জামাতে ইমামতি করছেন এবং জানা যায়, ঈদের আগে পশু কিনে যত্ন করা হতো, কুরবানির দিন ঈদের নামাজের পর সবাই আহার করতেন। এ দৃশ্যটির প্রামাণ্য ছবি আমরা জাহানারা ইমাম-এর অন্য জীবন গ্রন্থে পাই। তিনি উল্লেখ করেন—“বকরি ঈদে সকালে কোরবানি না হওয়া পর্যন্ত কেউ কিছু মুখে দিতেন না। পুরুষেরা গোসল সেরে নতুন কাপড় পরে নামাজ পড়তে যেতেন খালি পেটেই। ফিরে এসে একেবারে কোরবানি দিয়ে তারপর বাড়িতে ঢুকতেন।” এসব বিশ্লেষণে অনুমান করতে কষ্ট হয় না, বিশ শতক থেকে ঈদুল আজহার পরিবেশে ধর্মীয় আচারনির্ভরতা আনুষ্ঠানিক রূপ পায়।

এখানে উল্লেখ্য ঊনবিংশ শতকের শেষ প্রান্তে গরুকেন্দ্রিক দ্বন্দ্বের মর্মস্পর্শী সাহিত্যিক রূপায়ণ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর জনপ্রিয় মহেশ গল্পটি। গল্পে সরাসরি ঈদ উদযাপনের কথা নেই। কিন্তু এর প্রেক্ষাপট ও দ্বন্দ্ব কুরবানির পশু ও হিন্দু-মুসলিম সামাজিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে আবর্তিত। বাংলা সাহিত্যে ত্যাগের মর্ম ও সাম্প্রদায়িক সংকটের প্রতীকী উপস্থাপনায় ‘মহেশ’ অনন্য মাত্রা পেয়েছে।

বাংলা সাহিত্যে ঈদ উৎসবকেন্দ্রিক সাহিত্যধারা ঠিক এ লগ্ন থেকেই আনুষ্ঠানিক পরিণতি পায়। ঈদকে নিয়ে সর্বপ্রথম কবিতা রচনা করেন কবি সৈয়দ এমদাদ আলী (১৮৮০-১৯৫৬)। ১৯০০ সালে ঢাকায় প্রকাশিত ‘নবনূর’ পত্রিকায় তার ‘ঈদ’ নামক কবিতাটি প্রকাশিত হয়। ঈদ সকালের সূর্যোদয়ের সুন্দর বর্ণনা এবং মুসলিম জাহানের একতার আহ্বান ছিল কবিতায়—“কুহেলি তিমির সরায়ে দূরে, তরুণ অরুণ উঠেছে ধীরে।” ‘নবনূর’-এর পৌষ (১৩১১) সংখ্যায় প্রকাশিত হয় কবি কায়কোবাদ-এর ‘ঈদ’ ও ‘ঈদ আবাহন’ নামক দুটি কবিতা। তিনি লেখেন—“এই ঈদে বিধাতার কি যে শুভ উদ্দেশ্য মহান, হয় সিদ্ধ, বোঝে না তা স্বার্থপর সন্তান।” পত্রিকাটির ফাল্গুন সংখ্যায় (১৩১১) ঐতিহাসিক রামপ্রাণ গুপ্ত লেখেন ‘ঈদুজ্জোহা’ প্রবন্ধ। ‘ঈদ সম্মিলন’ নামক কবিতা লেখেন জীবেন্দু কুমার দত্ত।

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২) লেখেন ‘ঈদ সম্মিলন’ (১৯০৪) নামক প্রবন্ধ। প্রবন্ধে তিনি মুসলমানের ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের ওপর জোর দেন। তিনি লেখেন—“ঈদ সমাগমে আজি আমাদের সে দুঃখ যামিনীর অবসান হউক।...সমষ্টির মঙ্গলের জন্য ক্ষুদ্র স্বার্থ পদদলিত হউক।” কবি মোজাম্মেল হক (১৮৬০-১৯৩৩) ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় ১৩২৭ সালে ‘ঈদ’ কবিতায় উল্লেখ করেন—“আজ মিলনের দিন, গলায় গলায় মাখামাখি, আমির ফকির হীন।” কবি শেখ ফজলুল করিম ‘বাসনা’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘ঈদ’ (১৯০৮) কবিতায় লেখেন—“অলস অধম মোরা এখনো অবহেলে, যাবো রসাতলে।” অন্যদিকে কবি গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭-১৯৬৪) ‘সওগাত’ পত্রিকায় ১৩২৬ সালে কাহিনিনির্ভর ঈদ উৎসব কবিতা লেখেন। কবিতায় প্রত্যাশা করে বলেন—“এই ঈদ হোক আজি সফল ধন্য, নিখিল মানবের জন্য।”

ঠিক ওই সময় মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী তাঁর ‘ঈদুল আযহা’ প্রবন্ধে কুরবানির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তৎকালীন সব লেখকের লেখার প্রতিপাদ্য ছিল কুরবানির ঈদের মাধ্যমে মুসলিম ঐক্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহানুভূতির প্রচার করা। সব সাহিত্যিকের চেষ্টায় বিশ শতকের প্রথম দিকে ঈদুল আজহা বাংলা সাহিত্যে আনন্দ ও ঐক্যের উৎসব হিসাবে স্থান করে নেয়।
ঈদ উদযাপনের আনুক্রমিক ধারায় কাজী নজরুল ইসলাম-এর অবদান সবচেয়ে বেশি বৈচিত্র্যময় ও তাৎপর্যপূর্ণ। দুই ঈদ নিয়েই তাঁর সৃষ্টিশীলতা প্রবহমান ছিল। তবে কুরবানির ঈদকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে তিনি উৎসবটির দর্শনকে সামাজিক সাম্যের বার্তায় রূপান্তরিত করেছেন। ঈদুল আজহাকে নিয়ে নজরুলের জনপ্রিয় গান ঈদুজ্জোহার চাঁদ এলো ঐ অত্যন্ত উদ্দীপনাময়—“কোরবানী দে, কোরবানী দে, শোন খোদার ফরমান তাগিদ।”

নজরুলের দৃষ্টিতে কুরবানি শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির প্রতীক। ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্তি পেতে তিনি কুরবানির চেতনাকে রাজনৈতিক রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর ভাষায়—“পশু কোরবানী দেস তখন, আজাদ মুক্ত হবি যখন।” ১৯২০ সালে রচিত তাঁর বিখ্যাত কোরবানী কবিতায় তিনি আত্মত্যাগকে সত্য ও ন্যায়ের সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করেন। আবার তিনি সতর্ক করে বলেন—“আল্লাহর নামে, ধর্মের নামে, মানবজাতির লাগি, পুত্রেরে কোরবানী দিতে পারে, আছে কেউ হেন ত্যাগী।”

নজরুল-পরবর্তী কবি-সাহিত্যিকরাও তাঁর দেখানো পথে ঈদের মধ্যে সাম্য ও মানবতার বাণী অনুসন্ধান করেছেন। ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪) লিখেছেন—“আজকে এল খুশির দিন, দেখনা চেয়ে খুশির চিন।” কবি তালিম হোসেন তাঁর কবিতায় বলেন—“ঈদ মোবারক সালাম বন্ধু, আজিকে এই খুশরোজ।” আর আল মাহমুদ জীবনের অন্তিম উপলব্ধিকে ঈদের ত্যাগবোধের সঙ্গে মিলিয়ে গভীর আবেগে উচ্চারণ করেন—“ভালো মন্দ যা ঘটুক মেনো নেব এ আমার ঈদ।”

আবুল মনসুর আহমদ-এর ‘নায়েবে নবী’ গল্প এবং মাহবুব উল আলম চৌধুরী-এর ‘স্মৃতির সন্ধানে’ গ্রন্থেও কুরবানি ঈদের প্রসঙ্গ গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে।

একুশ শতকের বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি সাময়িকী ও বিশেষ সংখ্যাগুলো ঈদবিষয়ক নানা গল্প, কবিতা ও উপন্যাস প্রকাশ করছে। বর্তমান যুগের লেখকরা শহরের কর্মব্যস্ত মানুষের ঈদযাত্রা, গ্রামে ফেরা, পরিবারের পুনর্মিলন এবং ঈদকে ঘিরে সংস্কৃতির পরিবর্তনকে বিষয়বস্তু হিসেবে তাদের লেখায় স্থান দিচ্ছেন। তবে লেখার উপকরণে যাই থাক, এটি শাশ্বত যে—কুরবানির ঈদ মানে কেবল পশু জবাই বা উৎসবের আনন্দ নয়; বরং এর গভীরে রয়েছে আত্মত্যাগের চেতনা এবং মানবিক মূল্যবোধের পরীক্ষা। সাহিত্যিকরা বারবার তাদের সৃষ্টিকর্মে স্মরণ করিয়ে দেন যে, সত্যিকারের ত্যাগ হলো ভেতরের পশুত্বকে জবাই করে মানবিক মহত্ত্ব অর্জন।

বাংলা সাহিত্যে ঈদুল আজহার উপস্থাপন কেবল উৎসবের বাহ্যিক আনন্দচিত্র নয়; এর গভীরে নিহিত রয়েছে মানুষের আত্মিক জাগরণ, ত্যাগের মহিমা এবং সমাজমুক্তির স্বপ্ন। মধ্যযুগের ধর্মীয় কাব্য থেকে শুরু করে আধুনিক সাহিত্য পর্যন্ত কুরবানির ঈদ কখনো আত্মসমর্পণের প্রতীক, কখনো সাম্প্রদায়িক সংকটের প্রতিচ্ছবি, আবার কখনো শোষণমুক্ত মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রেরণা হয়ে ধরা দিয়েছে। সাহিত্যিকরা তাদের সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন—প্রকৃত কুরবানি কেবল পশু জবাইয়ে নয়, বরং মানুষের ভেতরের লোভ, অহংকার, হিংসা ও স্বার্থপরতাকে বিসর্জন দেওয়ার মধ্যেই নিহিত।

কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে সমকালীন কবি-সাহিত্যিকদের রচনায় ঈদুল আজহা তাই মানবতার মহোৎসব হয়ে উঠেছে। এই উৎসব বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি সামাজিক ঐক্য, সহমর্মিতা ও ন্যায়বোধের চেতনাকেও শক্তিশালী করেছে। বাংলা সাহিত্যে কুরবানির ঈদের এই দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ উপস্থিতি প্রমাণ করে—ঈদ কেবল ধর্মীয় আচারের নাম নয়; এটি মানুষের আত্মশুদ্ধি, মানবিক মহত্ত্ব ও সামাজিক সম্প্রীতির এক চিরন্তন আলোকধারা, যা যুগে যুগে সাহিত্যকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি মানুষকেও সত্য, সৌন্দর্য ও কল্যাণের পথে উদ্বুদ্ধ করেছে।


Previous Post Next Post