গল্পের পদাবলি এবং কবিযুগল
অনন্য কাওছার
১.
হেমন্তের পশ্চিম আকাশের দণ্ডায়মান সূর্যের তীর্যক রোদ ধানক্ষেতে পড়তেই সোনালি বর্ণি মাছের মতো আউশধানের তরতাজা শীষে বারংবার ঝিলিক তোলে; ধানের উষীর গন্ধে উড্ডীন পতঙ্গের নাসারন্ধ্র হতে ব্যূ-ব্যূ শব্দে দিগ্বিদিক রমরমা আর ফড়িঙের ঘূর্ণাবর্তে আদিগন্ত মাঠের সবুজে নবীন জোয়ার যেকারো চোখ আটকে থাকার মতোই বর্ণিল। এযেন কৃষকের দীর্ঘ গ্লানিবোধ নিরসনের প্রচেষ্টায় ধানক্ষেতের অভিনব সাজসজ্জা, বিচিত্র পরিযায়ী পাখিদের হেলেদুলে গুনগুন শব্দে জমিনে-জমিনে দৌড়ঝাঁপ। শীতবিকেলে ধানক্ষেতের ভাঁজে ভাঁজে দুগ্ধবতী গাভীর দুধেল রঙের মতো ঘন কুয়াশা আছড়ে পড়ে, চৌদিকে দাঁড়িয়ে থাকা দূরবর্তী গ্রামাঞ্চলের বৃক্ষসারি এক নিমিষেই মিলিয়ে যায় এবং নিকটস্থ যে বাঁকানো বিলের রাস্তাটা মাইলের পর মাইল চলে গেছে; সেই কাঁচা সড়কের ছোটোবড়ো হিজল-করচ-কদম গাছের সারিটা চোখের নিচে ঝাপসা হয়ে আসে। এই শীতকুয়াশায় দেবারাইবিলের নির্জন পথ ধরেই হেঁটে যান দেবারাই গ্রামের কবিযুগল। দখিনা বাতাসের দমকা হাওয়ায় উড়ছে তরুণ কবির বাবরি চুল, ধানের শীষের তালের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাঞ্জাবিও দোল খাচ্ছে, বাতাসে উড়ছে মাঝবয়েসী দ্বিতীয় কবির সিগারেটের ধোঁয়া। রাস্তাটা সরীসৃপ সাপের মতো ঘনঘন বাঁক নিয়ে দূরবর্তী অঞ্চলে অসতর্কে মিলেয়ে গেছে; প্রতিটি বাঁকেবাঁকে ঝোপঝাড়, উঁচুনিচু কদমগাছের সারিবদ্ধতা আড়াআড়িভাবে দাঁড়িয়ে আছে দেখে মনে হচ্ছে নিতান্ত স্কাউটিং বালকের প্রথম পদক্ষেপ।
১.
হেমন্তের পশ্চিম আকাশের দণ্ডায়মান সূর্যের তীর্যক রোদ ধানক্ষেতে পড়তেই সোনালি বর্ণি মাছের মতো আউশধানের তরতাজা শীষে বারংবার ঝিলিক তোলে; ধানের উষীর গন্ধে উড্ডীন পতঙ্গের নাসারন্ধ্র হতে ব্যূ-ব্যূ শব্দে দিগ্বিদিক রমরমা আর ফড়িঙের ঘূর্ণাবর্তে আদিগন্ত মাঠের সবুজে নবীন জোয়ার যেকারো চোখ আটকে থাকার মতোই বর্ণিল। এযেন কৃষকের দীর্ঘ গ্লানিবোধ নিরসনের প্রচেষ্টায় ধানক্ষেতের অভিনব সাজসজ্জা, বিচিত্র পরিযায়ী পাখিদের হেলেদুলে গুনগুন শব্দে জমিনে-জমিনে দৌড়ঝাঁপ। শীতবিকেলে ধানক্ষেতের ভাঁজে ভাঁজে দুগ্ধবতী গাভীর দুধেল রঙের মতো ঘন কুয়াশা আছড়ে পড়ে, চৌদিকে দাঁড়িয়ে থাকা দূরবর্তী গ্রামাঞ্চলের বৃক্ষসারি এক নিমিষেই মিলিয়ে যায় এবং নিকটস্থ যে বাঁকানো বিলের রাস্তাটা মাইলের পর মাইল চলে গেছে; সেই কাঁচা সড়কের ছোটোবড়ো হিজল-করচ-কদম গাছের সারিটা চোখের নিচে ঝাপসা হয়ে আসে। এই শীতকুয়াশায় দেবারাইবিলের নির্জন পথ ধরেই হেঁটে যান দেবারাই গ্রামের কবিযুগল। দখিনা বাতাসের দমকা হাওয়ায় উড়ছে তরুণ কবির বাবরি চুল, ধানের শীষের তালের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাঞ্জাবিও দোল খাচ্ছে, বাতাসে উড়ছে মাঝবয়েসী দ্বিতীয় কবির সিগারেটের ধোঁয়া। রাস্তাটা সরীসৃপ সাপের মতো ঘনঘন বাঁক নিয়ে দূরবর্তী অঞ্চলে অসতর্কে মিলেয়ে গেছে; প্রতিটি বাঁকেবাঁকে ঝোপঝাড়, উঁচুনিচু কদমগাছের সারিবদ্ধতা আড়াআড়িভাবে দাঁড়িয়ে আছে দেখে মনে হচ্ছে নিতান্ত স্কাউটিং বালকের প্রথম পদক্ষেপ।
কাশ্মীরি জাজিমের মতো নরোম ঘাসের স্তুপে কবিদ্বয়ের পায়ের স্পর্শ পড়তেই সড়কের সঙ্গে লাগোয়া ক্ষেতের ভেতর থেকে রকেট গতিতে একটি ইঁদুর দৌঁড়ে রিফুজির ঝোপের গহীনে লুকিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে সভয়ে অর্ধমুখ বের করে উঁকি দেয়। কনকনে ঠান্ডা শীতের কুয়াশা দিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছে, মাঠে-ঘাসে-বাতাসে শীত যেন আরো তীব্রতর হয়ে উঠেছে গতিময়। অথচ গ্রীষ্মের সাদাসিধে জামাকাপড় পরে শীতবস্ত্রবিহীন, ধীরপায়ে হেঁটে যাচ্ছেন কবিযুগল; ইঁদুরের সুতীক্ষ্ণ চোখের নিচে প্রশ্নবোধক যতিচিহ্নের বদলে বিস্ময়সূচক চিহ্নের টান পড়েছে। তাঁর ভাবময়ী চিন্তার উন্মেষ বৃক্ষের মতো ডালপালা অদ্রুত গজানোর পূর্বেই পশ্চিম আকাশে সূর্যের আলো বিলের পানিতে লঘুতর প্রতিবিম্বিত হয়ে অপলকে হারিয়ে গেল। ঘন কুয়াশার আড়ালে দূরের ঘোলাটে দৃশ্যাবলির মতো তাঁদের দেহাবয়বের আকৃতি কলমিলতার ঝোপের ভেতরে নিরাকার হয়ে গেছে এবং কলমিফুল হতে একঝাঁক জংলী পাখি উত্তরের দিকে উড়তে থাকে আর মহানন্দে গাইতে থাকে 'ক্রক-ক্র্যক-ক্র্য' গান।
২.
বিস্ময়ের ভঙ্গিমায় উত্তরের দিকে হাত উঁচিয়ে যুবা কবি বলেন, “এই পঙ্খী হাকালুকি হাওর পেরিয়ে এখানে। তাই সন্ধ্যায় সেই গন্তব্যে পৌঁছোতে তারা উদ্যমশীল।” ততক্ষণে ঝংলী পাখির গানের ধ্বনিও ঝিঁঝিপোকার বিরামহীন 'ঝিঁরি-ঝিঁরি-ঝিঁ' শব্দে দিগ্বিদিক তুলিয়ে যায়। অসীম আকাশেও বাদুড়ের এলোপাথাড়ি ছুটোছুটি, দেখে মনে হচ্ছে বন্দী কয়েদীর সদ্যমুক্তির স্বাধীনতা আকাশ-বাতাসের মধ্যেই যেমনটা প্রথম খুঁজে পায়, দীর্ঘনিশ্বাস নিয়ে মাটি ও বাতাসের সতেজ নির্মল ঘ্রাণে যেমন বিভোর করে; বাদুড়ের তেছড়া ওড়াউড়ি কুয়াশার বুকে প্রগাঢ় অনুভব সৃষ্টি করেছে তেমন। কবিদ্বয়ের সুতীক্ষ্ম চোখের গ্যালারিতে দৃশ্যাবলি খুচরো পয়সার মতো জমা হচ্ছে, কাব্যভাবনার জগতেও ঘাস ফড়িঙের মতো দোল খাচ্ছে।
বিলের কাঁচা সড়কে দুর্বাঘাস হাইব্রিড ঘাসের মতো গজিয়েছে, কোথাও যেন সারিসারি, কোথাও আবার মানুষের পদচারণে ফাঁকা হয়ে পড়ে আছে। বিলের শেষ সীমান্তে পৌঁছাতে হলে বিকেল কিংবা দিনদুপুরের সময় সবচেয়ে ভালো। তাই বিলের মাঝ বরাবর ঘাসের স্তুপে কবিদ্বয়ের বসার উপযোগী জায়গা বের করে নির্দ্বিধায় ঘাসের সবুজে উভয়ে বসে পড়েন। কনকনে মৃদুমন্দ হাওয়া কলমিলতার ফুলের তোড়া নাড়িয়ে তোলে, ডোবায় কচুরিপানার স্তুপ হেলেদুলে। যে জায়গায় কবিযুগল বসে নির্জনপ্রকৃতির প্রগাঢ় অনূভুতি উপলব্ধি করেন সেখান থেকে অর্ধকিলোমিটারের দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে একটি 'টিনঘর'। পৌঢ় কবি দূরের 'টিনঘর' লক্ষ্য করে বলেন, “বড়োই অদ্ভুত ব্যাপার! টিনঘরের দৃশ্যপট যেন চোখজোড়াকে মুগ্ধ করার চেয়েও ভীষণ কৌতূহলের।” যুবা বলেন, “দিব্যি কৌতূহলী বটেই।” যুবা কবির সঙ্গে পৌঢ় কবির আলাপচারিতা এভাবেই বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয় আর টিনঘরের গা ঘেঁষে ইংরেজি এফ-বর্ণের মতো কলাগাছের পাতাগুলো হাল্কা ঢেউ খেলতে থাকে। টিনের নড়বড়ে দরজার ফাঁকফোকর দিয়ে কনকনে ঠান্ডা শীতের বাতাস বয়স্ক বৃদ্ধযুগলের চামড়া-স্পর্শ করে যেন স্রষ্টার সৌন্দর্য বিদীর্ণ করতে চায়। বিলের মাঝামাঝি এই টিনঘর থেকে প্রধান সড়কে আসা-যাওয়ার উপযোগী রাস্তা নেই। ক্ষেতের সুরু আলপথ ধরে তাদেরকে যাতায়াত করতে হয় এবং বন্যার্ত দিনক্ষণে বিষাক্ত সাপের আতঙ্কে দিবারাত্রি অতিবাহিত হয় বৃদ্ধযুগলের। কখনও হাঁটুপানি মাড়িয়ে, আবার কখনও কাদাকার জমিন হয়ে; বন্যার্ত দিনে গলাপানিতে সাঁতার কেটে প্রধান সড়কে উঠতে হয় তাদেরকে। কবিদ্বয়ের ভাবনার সবচেয়ে বড়ো দিকের একটি তাদের জীবন-জীবিকার উৎসকথা। যতদূর জানা যায়, তাদের উভয়ই এই এলাকায় নবাগত। কৃষিনির্ভর জীবনযাপনে অতিকষ্টে দিনমান অতিবাহিত করছেন, খেতখামার,চাষাবাদ,ধানমাড়াই, মৎস-শিকার করেই খাদ্যের যোগান দিচ্ছেন। অর্ধকিলোমিটারের দূরত্বে ঘাসের সবুজে বসে; কুয়াশার আস্তরণ বিদীর্ণ করে যেন কবিযুগলের দৃষ্টিপাত সেই কলাগাছ বেষ্টিত টিনঘর।
৩.
“বউ, রাইতে এই টিনঘরে তাখন যায় না। শীতের রাইত ক্যামনে তাইয়ুম, কও তো?” বাহাত্তর বয়সী বৃদ্ধের হৃদয় নিংড়ানো কথাটি ষাটোর্ধ বয়সী স্ত্রীর বুকবিদীর্ণ করলেও সে চুপচাপ চৌকিতে বসে থাকে। কিচ্ছু বলে না। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বৃদ্ধলোকটি পাতলা কাঁথা মুড়িয়ে চিত হয়ে সেই যৌবনের উজ্জ্বল দিনগুলোর কথা ভাবতে থাকে। অতীতের রঙিন জীবনে বিপ্লব ঘটানোর উৎসাহে টগবগ শরীরে ফাগুনধারা মুক্তো হয়ে ঝরতো, মনে হতো ভবিষ্যতে গাড়িবাড়ি, জায়গাজমি, টাকাপয়সা সবকিছুই থাকবে। শখের নারীকে বিয়ে করে ঘরসংসারে সন্তানসন্ততি নিয়ে রাজা-রানির হালে জীবন কাটবে। কিন্তু শখের নারীকে আপন করতে যেয়ে যে এমনটা দুর্দশা ঘটে যাবে সেইকথা ছিল কল্পনাতীত। স্ত্রী পরম আদুরে বৃদ্ধার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলেন, ”আল্লাহ! জ্যামতে চালায় হ্যামতে চলুম, সবই তেনার ইচ্ছা, বুঝছইন?” বৃদ্ধযুগল অতীতের সোনালি দিনের উজ্জ্বল স্মৃতিকথা নিয়ে আলাপচারিতা করেন এবং বাইরের দমকা হাওয়া কলমিলতা হয়ে পুরো বিলের নির্জন মাঠে ছড়িয়ে পড়ে। কবিযুগল উদাম-মাঠে হেলেঞ্চা-পাতার ন্যায় থরথর করে কাঁপতে থাকেন।
৪.
যুবা কবি বলেন, “এই বিল যেন এক মহাকাব্যের মতো—প্রতিটি ঘাসের ডগায় লেখা আছে প্রকৃতির গল্প, প্রতিটি ঢেউ যেন সময়ের প্রতিধ্বনি।” পৌঢ় কবি শেষ সিগারেটে একটি দীর্ঘ টান দিতে দিতে বলেন, “সেই মহাকাব্যের নিগূঢ় সৌন্দর্য অবলোকন ও উপলব্ধি করতে স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ চোখের প্রয়োজন হয়। নিখাঁদ চোখ, নিখাঁদ হৃদয়।” মহাকাশের দিকে অপলক তাকিয়ে যুবা কবি বলে উঠেন, “তবে কী ইশ্বরের দয়ার্দ্র চোখের আড়ালে আজও বৃদ্ধযুগলের সংগ্রামী জীবন— তবে কী শীতবস্ত্র-বিহীন আপনার-আমার বেদনার্ত অমূলক জীবন; একি তবে সত্যিই আমাদের কাম্য ছিল?” পৌঢ় কবির জীবনের ভাঁজে ভাঁজে বেদনার ভয়ানক স্মৃতি, অমাবস্যার চেয়েও তীব্র দহন তাঁকে পদেপদে পদানত করে। তিনি একটি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলেন, “ঈশ্বরের নাট্য স্ক্রিপ্টে আমাদের কেবলই অভিনয় করে যেতে হচ্ছে। তাই যদি না হতো তবে কী মানুষ পারতো না একটি দীর্ঘজীবন নির্ভয়ে নির্বেদনা-নির্ব্যথায়-নির্বিষে কাটাতে? তবে কেন মানুষের জীবনে দীর্ঘ মনঃপীড়া, দীর্ঘ পতন, দীর্ঘ বেদনা, দীর্ঘ হতাশা?” এতটুকু বলেই পৌঢ় কবির কণ্ঠস্বর বেদনার অনির্বাণ বিষে ভারী হয়ে উঠলো, অতীতের দহনের স্মৃতিগুলো কলমিফুলের পাপড়ির মতো জীবন্ত হয়ে উঠে। তিনি অবচেতন মনে অবলোকন করেন সেই স্কুলজীবন থেকে দৈন্যদশার টানাপোড়েন। অবহেলার বৈরী বাতাসে কোমল মাটির মতো হৃদয়ের লালচে ক্ষতবিক্ষত। এইসে প্রৌঢ় কবি যারা অস্তিত্বের ভেতরে বিষাদের অশান্ত মহাসাগরের উতালপাতাল ঢেউ, ঢেউয়ের ভেতরে বিষাদের লাল-নীল আগ্নেয়গিরি। যে কিনা জীবনের প্রতিটি সংগ্রামী পদক্ষেপের শেষ সীমান্তে এসে কাচের গ্লাসের মতো একেবারে চৌচির হয়ে যান, আবারও উঠে দাঁড়ান, আবারও উদ্দেশ্যপ্রবণ অলৌকিক ধাক্কা। তবুও নিশাচর পাখির ডানায় আলতো পায়ে হেঁটে যেতে স্বপ্ন দেখেন, কবিতায় জাগতিক বাস্তবতা, বিষাদী বিদায়ী দিনের গান তুলে ধরেন। তিনি বারবার ফিরে আসেন নির্জন মাঠে প্রকৃতির হাতধরে পৃথিবীতে ফের বিপ্লবী হয়ে উঠার স্বপ্ন বুনেন। যদিও এখনও তিনি নিঃসঙ্গ পাখির মতো, কখনও যুবা কবির আড্ডায় উভয়ের দিনমান বর্ণিল হয়ে উঠে। এই কবিদ্বয়ের পায়ের তলায় শীতের শিশিরবিন্দু ঘাস-মাটি-পাখি-প্রকৃতি-নদী জানে সৌহার্দ্য সুদৃঢ় বন্ধনের কথা। উভয়ই জীবনের টানাপোড়েন অর্থসংকটে থেকেও বিরামহীন ঢেউয়ের মতো লিখে যাচ্ছেন মহাকাব্য, কবিতার অজস্র পঙক্তি।
৫.
হেমন্তের বিকেল। কৃষকেরা সারিবদ্ধভাবে মাথা নুইয়ে ধানের গোড়ায় কাঁচির ধারালো টানে জমিনের পর জমিন কেটে খানেক আলাপ সেরে নিচ্ছেন, কেউবা করচ গাছের সারিটার নিচে বসে সামান্য জিরিয়ে নিয়ে আবারও ধানের স্তুপ কাঁধে তুলে বাড়ির দিকে নিয়ে যান। সামান্য দূরত্বে কেউ কেউ মাড়াই দেওয়ার জন্য হালের গরুর লাগামে দঁড়ি লাগাচ্ছেন। বিপরীতে টিনঘরের সেই বৃদ্ধযুগলের জমিনের ধানক্ষেতে এককাঁচি ধান কাটা হয়নি। জমিনের সোনালি ধানের শীষে পাখিদের উড়াউড়ির দৃশ্যাবলি কবিযুগলের অন্তরে প্রগাঢ় হাহাকার তৈরি করে। মাঠের পর মাঠ কৃষকেরা সারিবদ্ধভাবে মহানন্দে ফসল কেটে, হাসিমুখে ঘরে তুলছে। মাঠের মধ্যে এক অন্যরকম জাগরণ, অথচ সেই টিনঘরের বৃদ্ধযুগলের কোনো বিচরণ নেই। টিনঘরের দিকে কবিদ্বয়ের পায়ের স্পর্শ পড়তেই দরজার আড়ালে থেকে বৃদ্ধা নারী আঁচলে মুখখানা ঢেকে নেন। বৃদ্ধার খবরাখবর নিতে গিয়ে কবিযুগল জানতে পারেন যে, তিনি পনেরো কুড়ি দিন ধরে বিছানায় পড়ে আছেন, শারিরীক অবস্থা দিনদিন খারাপের দিকে। তড়িঘড়ি করে কবিযুগল তাঁকে ডাক্তারের নিকটস্থ করেন এবং চারেক দিনের মাথায় তিনি মোটামুটি সুস্থ হয়ে উঠেন। বৃদ্ধ আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “বাবারা! তোমাগোর ঋণ ক্যামতে দিমু, আমাগো দেওনের কিচ্ছু নাই, তয় গেরস্তের.....” বৃদ্ধের কথাটি শেষ করার পূর্বেই পৌঢ় কবি বলেন, “আপনি ইশ্বরের মহিমায় সুস্থ হয়ে উঠবেন, আমরা তো কেবল নাট্য-স্ক্রিপ্টের অভিনয়টা করেছি মাত্র। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাইলে ঈশ্বরকে দিন। ঈশ্বর জগতের নেপথ্যে। সুতরাং আমরা কেউই জগতে কিচ্ছু না।” বৃদ্ধ লোকের চোখে কথাগুলো বেশ দুর্বোধ্য মনে হলো, পাল্টা জিজ্ঞাসা করার পূর্বেই যুবা কবি বলেন, “যেহেতু আপনি এখনও পুরোপুরি সুস্থ না, আমরা মিলে আপনার জমিনের ধান কেটে দিচ্ছি।” অনেক পিড়াপিড়ির পর বৃদ্ধযুগল তাদের অনুরোধে রাজি হয়ে দুইখান ধারালো কাঁচি কবিযুগলের হাতে তুলে দেন এবং বৃদ্ধ জমিনের নিকটস্থে থেকে সচক্ষে তাদের ধান কাটা দেখে আবিভূত হন। আর মনে মনে ভাবেন কবিরাও কী এতোটা নিখুঁতভাবে কৃষকের মতো ধানক্ষেতে পরিপক্ব হতে পারে, এটাও কী বাস্তবে সম্ভবপর?
তিনদিন ধরে কবিযুগল আর বৃদ্ধ মিলে জমিনের ধান কাটা শেষ করে মহানন্দে ফসল রৌদ্রে শুকিয়ে ঘরে তুলেন বৃদ্ধা নারী। গর্ভজাত সন্তানের মতো কবিযুগলের সঙ্গে সপ্তাখানেকে তারা অতি ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। শীতের পিঠাপুলি আয়োজন করে কবিযুগলকেও খাইয়েছেন। টিনঘরের চালটা মেরামত করবেন বলে বৃদ্ধযুগল সিদ্ধান্ত নেওয়ার তিনেক দিন পর নতুন চালটা সূর্যের আলোকে ঝিলিক তোলে। দিনেদিনে বৃদ্ধযুগলের চাষাবাদ-পশুপালন-খেতখামার থেকে বাড়তি লাভজনক পরিবর্তন এলো। এমন আর্থিক সচলতা আসায় নিজ এলাকায় কিছু একটা করবেন বলে ভেবে নিয়েছেন বৃদ্ধযুগল।
দেখতে দেখতে তিনবছর কেটে গেল। বৃদ্ধযুগল নিজ এলাকায় ছোটখাটো একটি ভাতের হোটেল খুলে বসেছেন। হোটেল মোটামুটি ভালোই চলছে। বিলের হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে শারীরিক অবনতি ঘটেছে বলে টুকিটাকি কাজ করছেন বৃদ্ধ। এখানে সিংহভাগ কাজ লোকটার বৃদ্ধা স্ত্রী আর নিকটাত্মীয় কেউ একজন মিলে করে নেন। অপরদিকে, কবিযুগল সেইকালে নিজেদের অজানা গন্তব্যের দিকে হাতড়ে ফিরছেন। বিলের নির্জন মাঠে প্রকৃতিদর্শনের পরিবর্তে নবীন প্রাকৃতিক জায়গা আবিস্কার করে নিয়েছেন। উভয়ের দিনমান যতটা সময় যাচ্ছে ততটা সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ হচ্ছে। যুবা কবি ধীরেধীরে বেড়ে উঠতে উঠতে জীবনসংকট অর্থসংকট নানাবিধ জটিলতা নিয়েই অতিমাত্রায় বিষণ্নতায় নিমজ্জিত। অতলান্তিক মহাপৃথিবীর পথে প্রান্তে যেরকম পরিযায়ী পাখি খাদ্যের যোগানে পাড়ি দিচ্ছে, বৈরী প্রতিকূল পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করছে; যুবা কবিও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে হাতড়ে ফিরছেন। অথচ তাতে দুশ্চিন্তা দুর্ভাবনা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিপরীতে, পৌঢ় কবি ততক্ষণে বয়সের ঊর্ধ্বগতিতে নানারকম অসুস্থতা শরীরে ঝোঁকে বসেছে। পারিবারিক সামাজিক আর্থিক জটিলতার মারপ্যাচে জীবনচক্র প্রায় অস্থিতিশীলতার দিকে। এখন জীবনকে আর জীবন মনে হচ্ছে না তাঁর। বলা যায়, কবিযুগলের গতিপ্রকৃতি এতটাই সংকীর্ণ এবং আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, দীর্ঘদিন ধরে বইটই কেনাকাটার আক্ষেপ বাতাসের সঙ্গে ভারী দীর্ঘশ্বাস হয়ে মিশে যায়। অর্থাবনতি এতটাই বেড়েছে যে বাৎষরিক ল্যাটল ম্যাগাজিন বেরা করা যাচ্ছে না দীর্ঘ চারবছর ধরে। দামী সিগারেট পরিবর্তন করে বাজারের সবচেয়ে সস্তা সিগারেট কিনতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে পৌঢ় কবির।
৬.
আবারও শীতের কনকনে কুয়াশা ধূম্রজালের মতো দিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছে। হাকালুকি হাওরের একঝাঁক পরিযায়ী পঙ্খী রাজকীয় ডানার পুনর্বিন্যাসে দেবারাইবিলের অগভীর পানিতে সমবেত। ডোবায় হেলেদুলে নবগঠিত হেলেঞ্চা আকাশের দিকে, আর হিমেল বাতাসে ভেসে আসছে শিশিরের জল। ঘাসের সবুজে কবিদ্বয়ের পায়ের স্পর্শ পড়তেই সড়কের সঙ্গে লাগোয়া ক্ষেতের ভেতর থেকে এখন আর ইঁদুর কিংবা নেউলের দৌড়ঝাঁপ নেই। যে সড়ক গ্রামের ভেতর থেকে ঢালু হয়ে সরীসৃপ সাপের মতো আঁকাবাঁকা মোড় নিতে নিতে বিলের শেষ সীমান্তে মিলিয়ে গেছে; সেই সড়কের পুরনো বটবৃক্ষের বয়সের ঊর্ধ্বগতির ছাপ স্পষ্ট। পক্ষান্তরে নবাগত সারিবদ্ধ হিজল-সেগুনের ডালপালা ভবিষ্যতের প্রগতির পূর্বাভাস দিচ্ছে। সেই দিগন্তের মাঠের সবুজে শীতবস্ত্র-বিহীন ঘাসের স্তুপে দাঁড়িয়ে আছেন কবিযুগল। বিলের মাঝামাঝি একটি ইটের দালান দূর থেকে সুতীক্ষ্ণ চোখের কৌতূহল উদ্রেক করে চলছে। মনে পড়ছে সেই পুরোনো দিনের বৃদ্ধযুগলের সংগ্রামী জীবন। সেই বৃদ্ধযুগল আর আগের মতো নেই। তাদের চোখেমুখে বয়সের ছাপ; যেন সুখের উপলব্ধি সুস্পষ্ট। অথচ কবিযুগলের জীবনের টানাপোড়েন যেন প্রকৃতির অংশ হয়ে গেছে। পৌঢ় কবি বলেন, “মানুষের জীবন বটবৃক্ষের মতো— কিছু শাখা কেটে যায়, কিছু শাখায় নতুন পাতা মেলে। কিন্তু আমরা কি কখনো পুরো বৃক্ষ হয়ে উঠতে পারি?' যুবা কবি মৃদু হেসে বলেন, “বটবৃক্ষও তো নিজের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকে। আমরা কেবল সেই ছায়া খুঁজছি।” কনকনে ঠান্ডা শীতের কুয়াশা আদিগন্ত মাঠে-ঘাসে-বাতাসে আছড়ে পড়ছে। শেষ সিগারেটের ধোঁয়া বাতাসের দমকা হাওয়ায় উড়ছে। ধোঁয়াশার মধ্যে ইটের দালানটি ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যায়। কবিরা হাঁটতে হাঁটতে মিলিয়ে যান দূরের কুয়াশার আড়ালে আর তাদের পায়ের ছাপ ঘাসের নরোমে রয়ে যায়। ফের এক রাখাল বালকের গল্পের সঙ্গে কবিযুগল জীবন্ত হয়ে উঠেন।
Tags:
গল্পসমগ্র
