অনন্য কাওছার
আসিফ একটা চিঠি ড. মনসুর মানিক স্যারের হাতে তুলে দিয়ে বলল, কয়েকজন অপরিচিত লোক আমার কাছে এই চিরকুট আর একটা সুটকেস দিয়ে বলেছে তোমার শিক্ষক মহোদয়ের হাতে পৌঁছে দিও।
মনসুর মানিক টেবিল থেকে মুখ ফিরিয়ে আসিফের দিকে তাকালেন। একহাতে পাঠরত বই বন্ধ করে বললেন, তুমি এতো রাতে কোথায় গিয়েছিলে?
বাতিঘর।
আবারও বই কিনতে গিয়েছো?
জি স্যার। আজকে প্রাইভেট থেকে কিছু টাকা পেলাম।
মনসুর মানিক এবার রাগান্বিত হয়ে বললেন, তোমাকে যে বললাম আমার লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে পড়তে। এখানে কি বইয়ের সংগ্রহ কম নাকি। শুধু শুধু টাকা খরচ করবে কেন?
আসিফ মাথা নিচু করে বলল, আপনার লাইব্রেরি থেকে নিয়মিত বই নিয়ে পড়ি। যে কটা বই আপনার লাইব্রেরিতে পাইনা কেবল সেগুলোই বাতিঘর থেকে কিনতে যাই।
মনসুর মানিক হাসিমুখে বললেন, তাহলে আমাকে বলে যেতে পারতে। আমি কিছু টাকা তোমাকে দিয়ে দিতাম।
লাগবে না স্যার। বেতন পাইছি।
বেতন কত টাকা পাও জানা আছে। হাজার পাঁচেক কি কোনো টাকা হলো। এতটুকু বলতে বলতে মনসুর মানিক মানিব্যাগ থেকে হাজার টাকার ৪ টা নোট বের করলেন এবং আসিফের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, আর কখনও বই কিনতে গেলে আমাকে জানিয়ে যেও। ঠিক আছে।
আসিফ হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ালো।
মনসুর মানিক চেয়ারের দিকে ইশারা করে তাঁকে বসতে বললেন। আসিফ চেয়ারে বসলো। কিছুটা সংকোচবোধ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, স্যার, আপনি এতো অমায়িক কেন? সবসময় মানুষের সাথে সুন্দর আচরণ করতে দেখি। মানুষ কি এতোটা ভালো হয় কখনও?
মনসুর মানিক মুচকি হেসে বললেন, আমরা মানুষের ভালো আচরণ লোকচুক্ষে দেখতে পাই বলে মানুষকে দেবতা সমতুল্য মনে করি। আবার যখন মানুষের মন্দ আচরণ প্রকাশ পায় তখন তাঁকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানব হিসেবে চিহ্নিত করি। অথচ আমরা কয়জনই বা জানি, প্রতিটা মানুষের মধ্যে লুকিয়ে আছে একজন দেবতা, একটা পশু। আমরা মানুষের মধ্যে দেবতা এবং পশুকে কখনই একত্রে দেখি না। দেখতে পাইনা। যে মানুষ তার হৃদয়ের দেবতাকে বাঁচিয়ে রাখে এবং হৃদয়ের পশুত্বকে পরাভূত করে সেই হয় মহামানব।
আসিফ মুগ্ধ হয়ে বলল, আমি বরাবরই আপনার কথায় মুগ্ধ হই। এবারও হলাম।
মনসুর মানিক কথা না বাড়িয়ে আসিফকে জিজ্ঞেস করলেন, চিরকুট আর সুটকেস তোমার হাতে কারা তুলে দিল।
চারজন অপরিচিত লোক। যাদের আগে কখনও দেখিনি।
তাদেরকে তুমি চিনতে পাওনি?
আসিফ মাথা নেড়ে বলল, জি না স্যার।
তারা দেখতে কেমন ছিল। অর্থাৎ পরনের পোশাকআশাক।
মোটাসোটা পোশাক। তাদের প্রত্যেকের চুল মেয়েদের মতো লম্বা।
মনসুর মানিক প্রবল আগ্রহ নিয়ে বললেন, তাদের চোখ, দেহের আকৃতি কেমন ছিল?
দেহের আকৃতি দানবের মতো। আমার কাছে মনে হয়েছিল তাঁরা হয়তো বাইরের দেশের মানুষ।
তোমার কাছে কেন মনে হলো তারা দেশের বাইরের?
আনিস বড়োবড়ো চোখে বলল, তাদের কথা বলার ধরন অনেকটা দুর্বোধ্য। এবং তাদের প্রত্যেকের চোখ লালনীল।
মনসুর মানিক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, লালনীল মানে?
দুজনের চোখ লাল। বাকি দুজনের নীল।
মনসুর মানিক বিস্ময়কর চোখে চিঠির দিকে তাকিয়ে আছেন। বিষয়টা তাঁর কাছে অনেকটা জটিল আর রহস্যজনক মনে হলো। আসিফের হাত থেকে চিরকুট আর সুটকেস নিয়ে তাঁকে নিজ ঘরে যেতে বললেন। আসিফ দুতলায় তাঁর নিজ কামরায় চলে গেল। মনসুর মানিক ভেতর থেকে দরজা আটকিয়ে চিঠি খুললেন। চিঠিতে যা লেখা ছিল তা নিম্নোক্ত—
শ্রদ্ধেয় শিক্ষক/সাহিত্য গবেষক
ড. মনসুর মানিক
'পাহাড় পয়েন্ট টুয়েন্টি সেভেন' নামক গ্রন্থ বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরের ইতিহাসের সম্ভাব্য মাইলফলক। আপনি যদি গবেষণার কাজে এই পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করতেন, আমরা খুবই আনন্দিত হতাম। আমরা যতটুকু পড়েছি এই পাণ্ডুলিপি বাংলা সাহিত্যের নতুন ইতিহাস রচনার মৌলিক মাধ্যম। এখানে এমনই এক সম্প্রদায়ের কথা বলা হয়েছে যারা বাংলা সাহিত্যের গুপ্ত কবি। যারা 'নীলপরি' নামক অঞ্চলে সাহিত্য চর্চা করতেন। 'পাহাড় পয়েন্ট টুয়েন্টি সেভেন' গ্রন্থের লেখক পঞ্চ তার্জিন। পাণ্ডুলিপি হাতের লেখা। সুটকেস খুললে পাণ্ডুলিপি পেয়ে যাবেন। যেখানে নীলপরি অঞ্চলের ইতিহাসও পাবেন।
ইতি
বিরামহীন।
(পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই আসবে)
