অনন্য কাওছার
আসিফ বাতিঘর থেকে জহির রায়হানের 'বরফগলা নদী' এবং হুমায়ুন আজাদের 'জালো চিতাবাঘ' নিয়ে বেরিয়ে এলো। বাইরের আবহাওয়া বেশ মনোরম। ঘাসের ওপর শুয়ে থাকার মতো ওয়েদার। আসিফ বাস অথবা সিএনজি না নিয়ে একটা রিক্সায় উঠলো। রিক্সা চড়ে শহর ঘুরতে তাঁর ভালোলাগে। শুধু তাই নয়, রিক্সা নেওয়ার পেছনে তাঁর প্রধান কারণ স্মৃতিচারণ। তাঁকে দেখলে কেউ ভাবতেই পারবে না যে, একটা সময় তাঁর আশেপাশে মানুষের বিড় আর কোলাহল ছিল। মূলত প্রতিটা নিঃসঙ্গ মানুষের অতীত বন্ধুবান্ধব আর প্রিয়জনের সমারোহে সমৃদ্ধ থাকে। কারণে বা অকারণে তাঁরা দলছুট পাখির মতো একা হয়ে যায়। আসিফও সেরকম একজন। যাকে ঘিরে ভার্সিটি ক্যাম্পাস রাজপথ একটা সময় আনন্দ-বিভোর ছিল। আজ কেউ নেই। নিজেকেই নিজে ছায়াপাতার মতো অনুসরণ করে। ঠিক এইমুহূর্তে আসিফ আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। রিক্সার চাকা পিচঢালা পথে অবিরাম এগোচ্ছে। আসিফের কণ্ঠে বেজে উঠছে কবি জীবনানন্দের বিখ্যাত কবিতার লাইন— হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে। কবিতাটা শেষ করে আসিফ ভাবছে একজন কবি কীভাবে লিখতে পারেন এমন একটা কবিতা? 'বনলতা সেন' কবিতার জন্য কবি জীবনানন্দও পেতে পারতেন নোবেল পুরস্কার। তখন রিক্সা চালক বলে উঠলো, মামা, এই প্রশ্নটা আমারও মাথায় একবার এসেছিল।
আসিফ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, মামা, আপনি কতটুকু লেখাপড়া করেছেন?
অনার্স প্রথম বর্ষ পড়েই রিক্সা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
পড়াশোনা বাদ দিলেন কেন?
পেটের ধান্দায়।
আসিফ চুপ করে থাকলো। কিছু বলল না।
রিক্সা চালক আর কথা না বাড়িয়ে বলল, আপনি কী কবিতা পছন্দ করেন? আমিও খুব করতাম। একবার একটা কবিতা লিখে কলেজে সবার বাহ্ বাহ্ পেয়েছিলাম।
আসিফ বলল, এখন কি নিয়মিত লিখেন।
না, মামা। একদিন একজন বলল, তোমার লেখালেখি হুবহু মহাদেব সাহার কবিতার নকল। সত্যি বলতে কী, নকল করেছি ঠিকই। কিন্তু ওই বেটা কীভাবে বুঝল যে হুবহু নকল। হয়তো মহাদেব সাহার সবকটা কবিতা ওই শালার মুখস্থ ছিল।
আসিফ খিলখিল করে হেসে উঠলো।
রিক্সা চালক বলল, মামা হাসবেন না, আমি কবিতার কিছু লাইনের পরিবর্তন করেছিলাম। যেমন, সাগরের জায়গা নদী। পাহাড়ের জায়গায় হিমালয়। আকাশের জায়গায় বাতাস। তারপরও বেটা কীভাবে যে টের পেল। বুঝা মুশকিল।
আসিফ হাসতে হাসতে বলল, তারপর?
তারপর আর কি, লেখালেখি ছেড়ে দিলাম।
আসিফ বলল, লেখালেখি ছেড়ে দিয়েছেন ভালোই হয়েছে। এভাবে নকল করতে থাকলে রবীন্দ্রনাথও আপনার থেকে নিরাপদ থাকতেন না।
রিক্সা চালকের সাথে আলাপ আর দীর্ঘ হলো না, আসিফের বাসার নিচে রিক্সা থেমে গেল। ভাড়া বের করতে যাবে ঠিক এমন সময় পাশ থেকে দুচার জন আসিফের দিকে ছুটে এলো। তাদের কণ্ঠস্বরে কেবল একটাই ধ্বনি, এই আসিফ। দাঁড়া। আসিফ। দাঁড়া।
(পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই আসবে)
