ক্ষুরধার দ্রোহ, বিষাদগ্রস্ত ও গভীর মনস্তাত্ত্বিক স্বর ‘নিষিদ্ধ রেলিংয়ে সন্ন্যাস’
তৈমুর খান
কবি অনন্য কাওছার-এর কাব্যগ্রন্থ ‘নিষিদ্ধ রেলিংয়ে সন্ন্যাস’(ফেব্রুয়ারি ২০২৭)সমকালীন বাংলা কবিতায় এক ক্ষুরধার, বিষাদগ্রস্ত ও গভীর মনস্তাত্ত্বিক স্বর। সমগ্র বইটি জুড়ে ব্যক্তিক বিপন্নতা, রাজনৈতিক ক্ষোভ, সমাজ-বাস্তবতার অবক্ষয়, প্রেমের অতৃপ্তি এবং এক ধরনের অন্তর্মুখী সন্ন্যাস বা নিরাসক্তি পাশাপাশি উঠে এসেছে। তিনটি পর্যায়ে কাব্যগ্রন্থটির বিষয়ভাবনা, নির্মাণকৌশল এবং শৈল্পিক সীমাবদ্ধতার পূর্ণাঙ্গ ও সংহত মূল্যায়ন করা যায়।
এক.বহুমাত্রিক কাব্যদর্শন
----------------------------------------------------
‘নিষিদ্ধ রেলিংয়ে সন্ন্যাস’ নামটি নিজেই একটি গভীর রূপক বহন করে। ‘নিষিদ্ধ রেলিং’ যেন জীবনের সীমা, সামাজিক বিধিনিষেধ ও ঝুঁকির প্রান্তরেখা; আর সেখানে ‘সন্ন্যাস’ হলো জাগতিক মোহভঙ্গ ও বিচ্ছিন্নতার আত্মিক আশ্রয়।
সমগ্র কাব্যগ্রন্থটিতে প্রায় অর্ধশত কবিতার সমাহার রয়েছে। শুরুতেই ‘নিসর্গজ ভাষণ’-এ মা, মাটি ও প্রকৃতির প্রতি কবির যে গভীর আর্তি ফুটে ওঠে, ক্রমান্বয়ে তা রূপ নেয় সমকালীন দুঃসময়, নাগরিক বর্বরতা এবং রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদে। কবি একদিকে যেমন প্রেমের দুর্বোধ্যতা নিয়ে কাতর (‘তোমাকে বুঝে উঠতে পারিনি’, ‘হেলেনা আমার’), অন্যদিকে স্বদেশের দুরবস্থা ও বাকস্বাধীনতার সংকোচন দেখে ক্ষুব্ধ (‘উলঙ্গ স্বদেশ’, ‘অস্ত্রের মুখে করতালি’, ‘মুখোমুখি রাইফেল’)। তাঁর প্রকাশভঙ্গি একদিকে সুররিয়ালিস্টিক, অন্যদিকে নির্মম বাস্তববাদী।
কবির এই কাব্যদর্শন মূলত পাঁচটি প্রধান মাত্রায় বিন্যস্ত—
দ্রোহ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও রাজনৈতিক ক্ষোভ:
কবি তাঁর সময়ের সংকট থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখেননি। তোষামোদি সংস্কৃতি, সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবী এবং সমকালীন রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কবির স্পষ্ট উচ্চারণ লক্ষ করা যায়। ‘নীরব বিপ্লব’ কবিতায় তিনি সরাসরি আঘাত করেন চাটুকারদের:
“তোমরা যারা মৃতদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকো ভান করে বসো শতাব্দীর বুদ্ধিজীবী ও কবি আমি আজ তোমাদের জন্য নীরব বিপ্লব।”
আবার ‘অস্ত্রের মুখে করতালি’ ও ‘মুখোমুখি রাইফেল’ কবিতায় বাকস্বাধীনতাহীন এক ভয়ার্ত পরিবেশের চিত্র ফুটে ওঠে—যেখানে শব্দ বসালেই রাইফেলের মুখোমুখি হতে হয়, এবং কবিতা যেন তৈলমর্দনমুক্ত হতে ভয় পায়।
অস্তিত্ব সংকট, নিঃসঙ্গতা ও ‘সন্ন্যাস’ চেতনা:
কবির কাব্যদর্শনে একটি প্রকট দিক হলো তীব্র একাকিত্ব ও আত্মিক নির্বাসন। তিনি নিজেকে এই চেনা পৃথিবীর সাথে খাপ খাওয়াতে পারেন না; তাঁর মনে হয় তিনি ‘জন্মে ঠকেছেন চিরকাল’। ‘অস্বীকৃত সক্রেটিস’-এ তিনি উচ্চারণ করেন:
“পূর্বপুরুষের দীনতার সিংহাসনে বসে বুঝেছি প্রতিটা জীবন্ত মানুষ সক্রেটিস
তবে সবাই স্বীকৃত নন।”
অন্যদিকে ‘হরিৎজলের আদিম উৎসব’ ও ‘নিষিদ্ধ রেলিং’-এ তিনি আধুনিকতার জটিলতা ছেড়ে গুহাবাসী, পুরোপলীয় কাল কিংবা সন্ন্যাসীর গভীর ধ্যানের দিকে ধাবিত হন। তাঁর সন্ন্যাস সংসারবিমুখতা নয়, বরং যন্ত্রণাদীপ্ত আত্মার এক ধরনের স্টোয়িক (Stoic) নিরাসক্তি।
প্রেম, বিরহ এবং অধরা ‘হেলেনা’:
কাব্যের প্রেমচেতনা গতানুগতিক রোমান্টিকতায় বন্দি নয়, বরং তা জটিল ও দ্বন্দ্বমুখর। ‘হেলেনা’ কিংবা ‘শুদ্ধতমা’ চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে কবি নারীর চিরন্তন রহস্যময়তা ও অধরা রূপ তুলে ধরেন। ‘তোমাকে বুঝে উঠতে পারিনি’ কবিতায় প্রেমের আকুলতা এবং ব্যর্থতার গভীর স্বীকারোক্তি ফুটে ওঠে:
“তোমাকে বুঝে উঠতে আমার যৌবনের উপর নেমে আসে বার্ধক্য; বেড়ে যায় হাতের কাঁপন...
নারী, তোমাকে বুঝে উঠতে পারিনি আমি।”
আবার ‘হেলেনা আমার’ কবিতায় প্রমিত ভাষা বনাম হৃদয়ের আদিম অনুভূতির টানাপোড়েন প্রকাশিত হয়। প্রেম এখানে কেবল মিলন নয়, এক ধরনের অস্তিত্বের নীল বিষাদ ও মাতাল করা অবসাদ।
শ্রেণিচেতনা ও মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি:
সমাজের অবহেলিত মেহনতি মানুষের প্রতি কবি গভীর সংবেদনশীল। ‘শ্রমিক’ কবিতায় তিনি অকপটে তুলে ধরেন আধুনিক সভ্যতার অকৃতজ্ঞতা:
“আমার ঘামের গন্ধে ভিজে ভিজে
তারপর যে মানবসভ্যতার ঝলমলে নগরী... সেখানে আমি আজ তীব্র অবহেলিত
আমি শ্রমিক—”
সমাজের ধর্ষিতা নারী, বাদাম বিক্রেতার বারুদ বুক কিংবা যুদ্ধবিধ্বস্ত প্যালেস্টাইনের বেদনা কবির ব্যক্তিগত যন্ত্রণায় রূপান্তরিত হয়।
পরাবাস্তবতা (Surrealism) ও চিত্রকল্পের বিস্তার:
শব্দচয়ন ও চিত্রকল্প নির্মাণে পরাবাস্তব অনুভূতির ছাপ অত্যন্ত স্পষ্ট। ‘সুররিয়ালিজম’ কবিতায় সময় ও মহাবিশ্বকে ভেঙে তিনি নতুন দৃশ্যপট তৈরি করেন—যেখানে মেট্রোরেল অন্ধকারের দিকে চলে যায়, টাইটানিক ইউরেনাসে ভাসে, আর বিরহে আটলান্টিক মহাসাগর পরিণত হয় আইসবার্গে। রক্তাপ্লুত শার্ট, নারকীয় হিম, লাশের মিছিল, ফসিলের গন্ধ, ভিসুভিয়াস ও আইসবার্গের মতো তীব্র ও সংঘাতময় প্রতীকগুলো তাঁর কবিতাকে এক পরাবাস্তব গাঢ়ত্ব দিয়েছে।
দুই.
শিল্পকুশলী নির্মাণশৈলী ও শব্দব্যবহারের স্বাতন্ত্র্য
--------------------------------------------------------
অনন্য কাওছারের কবিতাগুলোর অন্যতম বড় শক্তি হলো এর শিল্পকুশলী নির্মাণশৈলী এবং স্বতন্ত্র ও বহুমুখী শব্দব্যবহার। কবির প্রকাশভঙ্গিতে একদিকে রয়েছে পরাবাস্তববাদী কল্পচিত্রের বিস্তার, অন্যদিকে রয়েছে সমকালীন সমাজ-বাস্তবতার রূঢ় ও প্রখর শব্দগুচ্ছের সংঘর্ষ। কাব্য নির্মাণের বিশেষ কৌশলগুলো লক্ষণীয়:
১. বিপরীতধর্মী শব্দের সংঘর্ষ ও ‘অক্সিমোরন’ (Oxymoron)-এর প্রয়োগ:
কবি এমন সব বিপরীতধর্মী ভাব ও বস্তুর সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন, যা পাঠকের মনে তীব্র সংবেদ তৈরি করে। ‘নারকীয় হিম’ ও ‘সবুজ দাবদাহ’-র মতো ধারণায় সাধারণ অনুভূতির বিপরীত রূপ নির্মিত হয়:
“আমার বিশ্বাসের কপালে কে যেন জ্বালিয়ে দেয় নারকীয় হিম,
ঘাসের জাজিমে বসে টের পাই গহীন অরণ্যের সবুজ দাবদাহ।” (কবিতা: নারকীয় হিম)
এখানে ‘হিম’ শীতল হলেও তা ধ্বংসাত্মক, আবার ‘সবুজ’ স্নিগ্ধ হলেও তার ভেতরে বিরাজ করছে অদৃশ্য ‘দাবদাহ’—যা অস্তিত্বের সংকট নির্দেশ করে। একইভাবে প্রতারণাপূর্ণ কূটনীতি বোঝাতে তুষার ও আগুনের সংঘাতময় রূপক ব্যবহার করেন:
“যেন তুষারে আগুন ঢেলে মিথ্যে আশ্বাস শোনানোর কূটনৈতিক ব্রিফিং” (কবিতা: কূটনৈতিক ব্রিফিং)।
২. পরাবাস্তববাদী চিত্রকল্প (Surrealistic Imagery):
বাস্তব পৃথিবীর যুক্তিশৃঙ্খল ভেঙে অবচেতন মন ও পরাবাস্তব দৃশ্যপট তৈরি করা হয়েছে, যা মানসিক অস্থিরতা ও মহাজাগতিক বিচ্ছিন্নতার প্রতীক:
“যদি বলি টাইটানিক জাহাজ আবারও সমুদ্রের জলে
ভেসে যাচ্ছে ইউরেনাসের অকল্পিত মহাবিশ্বে,
...যদি বলি তোমাকে ছাড়া, কেবল তোমারই অবহেলায়
আটলান্টিক মহাসাগরও হয়ে যাচ্ছে আইসবার্গ,
এবং তোমার অভাবে আমার জীবনেও
সতেরো কোটি তিমিরপুঞ্জ।” (কবিতা: সুররিয়ালিজম)
ব্যক্তিক বিচ্ছেদ ও শূন্যতাকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ও মহাসমুদ্রের হিমশীতল শূন্যতায় রূপান্তরের এই কৌশল অত্যন্ত বলিষ্ঠ।
৩. শরীরসংক্রান্ত ও রক্তমাংসের শব্দাবলি (Somatosensory / Anatomical Diction):
ভাববাদী কল্পনায় ভেসে না থেকে কবি কবিতাকে শারীরিক অনুভূতি ও মানবদেহের জৈবিক কাঠামোর সাথে যুক্ত করেছেন। ‘অস্থিমজ্জা’, ‘হাড়গোড়’, ‘শ্বাসনালী’, ‘মেরুদণ্ড’, ‘মাংসপেশি’, ‘অলিন্দ’ প্রভৃতি শারীরবৃত্তীয় শব্দের প্রয়োগ সুরকে ধারালো করেছে:
“আমার পা আরো দীর্ঘ হচ্ছে
মৃত্তিকার অস্থিমজ্জা ছিঁড়েখুঁড়ে
বৃক্ষের ডালপালার মতো গজিয়েছে
পায়ের অলৌকিক ছাপ;” (কবিতা: আমার পা, আঙুল)
প্রেমিকার প্রতি নিরাসক্তি ও আত্মবিনাশের রূপও তিনি একই শারীরবৃত্তীয় ভাষায় প্রকাশ করেন:
“কেন তবে খুঁজেছ আমার বরফের মস্তিষ্ক? কী দরকার
পড়েছে আমার দেহের কঙ্কাল- আঙুলের অবহেলিত
হাড্ডি- অস্থিমজ্জার নরম গন্ধ...” (কবিতা: কী চাইতে এসেছো, হেলেনা)।
৪. প্রাগৈতিহাসিক ও আদিম অনুষঙ্গের ব্যবহার:
নাগরিক যান্ত্রিকতা ও অবক্ষয়ের বিপরীতে কবি ফিরে গেছেন আদিম যুগ, গুহাবাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক সময়ে। মানুষের পাশবিক অবক্ষয় প্রকাশে ব্যবহৃত হয়েছে প্রাগৈতিহাসিক দানবের রূপক:
“হাসির ঝলকে ঝরে পড়ে পাশবিক যন্ত্রণা
নাভিমূলে নেচে ওঠে দৈত্যের আদিম উৎসব।
...নখদর্পণে খেলা করে টাইরানোসরাস।” (কবিতা: কত সহজে বদলে যায় মানুষ)
আবার ধ্যানের অন্বেষণে আদিমতার শান্তিতে প্রত্যাবর্তন দেখা যায়: “...চেতনায় যার নিসিন্দা পুরোপলীয় নদীর আদিম উৎসব।” (কবিতা: হরিৎজলের আদিম উৎসব)।
৫. রাজনৈতিক ও সমকালীন রূঢ় পরিভাষা:
চিরাচরিত কোমল শব্দের পরিবর্তে বর্তমানের কঠোর সামাজিক-রাজনৈতিক পরিভাষা কবিতার মূল উপাদান হয়েছে। ‘ব্যারিকেড’, ‘কার্বনডাইঅক্সাইড’, ‘ভেটো ক্ষমতা’, ‘জাতিসংঘ’, ‘ডলার’, ‘লুক্সেমবার্গ’, ‘তৈলমর্দন’, ‘রাইফেল’ প্রভৃতি শব্দের প্রয়োগে সমকালীন ক্ষোভ তীব্র রূপ পেয়েছে। যেমন বাকস্বাধীনতা হরণ প্রসঙ্গে:
“কোনোভাবেই যেন একটি তৈলমর্দন বিহীন কবিতা
জনসম্মুখে বেরিয়ে আসতে না পারে
...ইদানীং ঘাতকের অস্ত্রের মুখে বেমালুম করতালি” (কবিতা: অস্ত্রের মুখে করতালি)
কিংবা আন্তর্জাতিক রাজনীতির ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় প্রেমিকার সুরক্ষা চাওয়া:
“কেবল তোমার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে
পরাশক্তি নেতাদের বিরুদ্ধে বসাবো গোপন বৈঠক;
কেড়ে নেব জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতা।” (কবিতা: মাধবীলতার নিরাপত্তাব্যবস্থা)।
৬. ছন্দ ও কাঠামোগত কৌশল (Structural Dynamics):
মুক্তক ও গদ্যরীতির সাবলীল মিশ্রণ: প্রথাগত অক্ষরবৃত্ত বা মাত্রাবৃত্তের নিয়মে বন্দি না হয়ে কবিতা ভাব ও অন্তর্মুখী ক্ষোভের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়েছে।
প্রশ্নবাণ ও আত্মকথন (Rhetorical Questions): পাঠককে আলোড়িত করতে দীর্ঘ আত্মজিজ্ঞাসা ছুড়ে দেওয়া হয়েছে:
“তোমারও কি মৃত্যুর মতো লাগে
জীবিত শরীরের ভেতরে আজকাল
লাশের গন্ধ পাও কি রোমান্তা?”
(কবিতা: রোমান্তার প্রতি)
শব্দের ব্যক্তিত্বায়ন (Personification): ভাষাকে নিছক ভাবপ্রকাশের মাধ্যম না রেখে তাকে একটি স্বতন্ত্র জীবন্ত সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে:
“শব্দেরা ঠিকঠাক বসছে না টেবিলে
নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে যেন লাশের কাতারে ...ইদানীং শব্দেরা বোবা প্রাণীর মতো নড়েচড়ে ওঠে”
(কবিতা: আমার দুর্দিনের ভাষা)।
তিন.
নন্দনতাত্ত্বিক খামতি, দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা
---------------------------------------------------------
স্বর ও বিষয়ভাবনার তীব্রতা সত্ত্বেও শিল্পরূপ ও নান্দনিক পরিশীলনের বিচারে পাণ্ডুলিপিটিতে বেশ কিছু স্পষ্ট দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়:
ক্লিশে শব্দ ও উপমার পৌনঃপুনিকতা: পাণ্ডুলিপিজুড়ে কিছু নির্দিষ্ট শব্দের অতিব্যবহার কবিতাগুলোকে ধারণাগতভাবে একঘেয়ে করে তুলেছে। বিশেষ করে ‘ভিসুভিয়াস’, ‘সাইবেরিয়া’, ‘নাইটিংগেল’, ‘আইসবার্গ’, ‘লাশের মিছিল’, ‘হিমশৈল’ ইত্যাদি শব্দ বারবার বিভিন্ন কবিতায় ফিরে এসেছে (‘তোমার অবর্তমানে যেদিকেই পা ফেলি’, ‘নীরব বিপ্লব’, ‘পুষ্পিত মঞ্চ’, ‘বর্ণমালার শরীরে ব্যারিকেড’ ইত্যাদি)। এই পৌনঃপুনিকতার কারণে শব্দগুলোর চিত্রকল্প নির্মাণের অন্তর্নিহিত শক্তি নষ্ট হয়ে তা ক্লিশে রূপ ধারণ করেছে।
গদ্যধর্মী বিবৃতি ও রাজনৈতিক স্লোগানের চাপ: অনেক কবিতায় অনুভূতির তীব্রতা সংকেতময় কাব্যের রূপ না পেয়ে চটুল পদ্য বা বিবৃতিধর্মী পঙক্তিতে পর্যবসিত হয়েছে। যেমন ‘উলঙ্গ স্বদেশ’ কবিতায়:
“কবিতায় দলীয়করণের নোংরা গন্ধ
আজকাল কবির মস্তিষ্কে বিব্রত সংলাপ আজকাল তৈলমর্দন ছাড়া কিছুই দেখি না...”
কিংবা ‘নীরব বিপ্লব’ ও ‘অস্ত্রের মুখে করতালি’-র কিছু চরণ পাঠ্যবই বা খবরের কাগজের ক্ষোভের মতো শোনায়, যেখানে শিল্পের প্রয়োজনীয় দূরত্বের (aesthetic distance) সুস্পষ্ট অভাব রয়েছে।
অপ্রয়োজনীয় ইংরেজি ও চলতি শব্দের বেমানান সংমিশ্রণ: কবিতার ধ্রুপদী বা মগ্ন মেজাজের ভেতর হঠাৎ আরোপিত ইংরেজি শব্দের ব্যবহারে পঙ্ক্তির সংহতি ধাক্কা খেয়েছে। যেমন ‘বেদনার রেললাইন’ কবিতায়:
“দেখেছি সফেদ বিড়ালের কিউট পদাঙ্ক, সাদা ঠ্যাং”
এখানে ‘কিউট’ শব্দটি কবিতার বেদনার্ত আবহকে লঘু করে ফেলেছে। একইভাবে ‘ডিপ্রেশন’, ‘প্যারাডাইস’, ‘সুইমিংপুল’, ‘টিউন’, ‘টুর্নামেন্ট’ শব্দগুলো বহু জায়গায় মূল অনুভূতির সঙ্গে জৈবিকভাবে মিশতে পারেনি।
ভাষিক বৈপরীত্য ও অলংকরণের অসংগতি: তৎসম গম্ভীর শব্দের পাশে হঠাৎ অতি-চটুল বা গ্রাম্য/চলতি শব্দের ব্যবহারে ছন্দপতন ঘটেছে। যেমন ‘পুষ্পিত মঞ্চ’ কবিতায় সংখ্যার হরফে লেখা হয়েছে: “পাঁজরে ০১ কোটি ভিসুভিয়াস”—কবিতায় এভাবে সংখ্যায় ‘০১ কোটি’ লেখা অপেশাদার ও দৃষ্টিকটু। আবার ‘ডলার’ কবিতাটি একটি চমকপ্রদ অণু-কবিতা হতে পারত, কিন্তু তা ব্যঞ্জনা তৈরি না করে একরৈখিক স্থূল মন্তব্যে পর্যবসিত হয়েছে:
“ডলার ডলার করতে করতে
কুঁড়েঘর থেকে বেরিয়ে এলো
একদল যুবতী”।
বানান ও মুদ্রণজনিত অসতর্কতা: পাণ্ডুলিপিজুড়ে প্রমিত বানানের বেশ কিছু অসতর্ক ভুল রয়েছে; যেমন—‘চত্ত্বরে’ (হবে চত্বরে), ‘হৃদপিণ্ড’ (হবে হৃৎপিণ্ড), ‘ধ্বসে’ (হবে ধসে), ‘মনিষী’ (হবে মনীষী), ‘লবন’ (হবে লবণ), ‘পোড়ে’ (হবে পুড়ে) এবং ‘ভয়নিখ’ (সম্ভবত মুদ্রণপ্রমাদ)।
দীর্ঘ কবিতার কাঠামোগত সংহতির অভাব: ‘তোমাকে বুঝে উঠতে পারিনি’ কিংবা ‘হেলেনা আমার’ কবিতাগুলোতে একই ভাব বারবার ঘুরিয়ে বলা হয়েছে। ‘তোমাকে বুঝে উঠতে পারিনি’ কবিতায় ধুয়ার মতো একই বাক্যের পুনরাবৃত্তি কবিতার বিস্তার ঘটালেও তার ভাবগত গভীরতা বাড়ায়নি। অনেক কবিতাই অপ্রয়োজনীয় স্তর বাদ দিয়ে আরও দুই-তিন স্তবক আগেই শেষ করলে তার শৈল্পিক অভিঘাত আরও সংহত হতে পারত।
সামগ্রিকভাবে ‘নিষিদ্ধ রেলিংয়ে সন্ন্যাস’ সমকালীন অস্থিরতা, প্রতিবাদ ও অস্তিত্বের সংকটে নির্মিত এক ক্ষুরধার উচ্চারণ। বিষয়বস্তুর ঋজুতা ও পরাবাস্তব নির্মাণের অনন্যতা যেমন এর প্রধান সঞ্চয়, তেমনই ক্লিশে শব্দের অতিব্যবহার ও বিবৃতির বাহুল্যমুক্ত হতে পারলে কাব্যগ্রন্থটির শৈল্পিক ব্যঞ্জনা আরও গভীর ও কালজয়ী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে।
#
নিষিদ্ধ রেলিংয়ে সন্ন্যাস: অনন্য কাওছার, সিলেট, বাংলাদেশ (প্রকাশক: বুনন, ৫০৪, কাকলী শপিং সেন্টার, জিন্দাবাজার, সিলেট), প্রচ্ছদ: নির্ঝর নৈঃশব্দ্য,মূল্য: ২০০ টাকা (Rs: ২০০, $: ১০)

