গুচ্ছ কবিতা — রিপন বর্মন



গুচ্ছ কবিতা 
রিপন বর্মন


সত্য বলা কাক
ভেতরে ভেতরে রাজ্যের ধূলাবালি, নর্দমা—
উপর উপর হাসিমুখ নিয়ে
দিব্যি এগিয়ে যাচ্ছি আমরা,
যেন কিছুই হয়নি।

এ শহরে কোনো মৃত্যু নেই,
রক্ত, আতঙ্ক নেই।
ভাগাড়ের পাশে শুধু কটা কাক—
ওরা বড্ড অবুঝ,
অকপটে সত্য বলে;
সত্য লুকাতে এখনও যে শেখেনি।

নদী এখানে ভয়ের নাম
মনের খোঁজ করতে করতে কখন যে
পরম প্রেম হাপিত্যেশের চাদরে মুড়িয়ে যায়—
তার মস্ত বাড়ির ছাদে এখন চৈত্রের কর্কশ রোদ…
এখানে আর পাখি আসে না,
পরের জন্মে কারও আর বনহরিণী হওয়ার শখ নেই।
নদী এখানে ভয়ের নাম!
কুমির রক্তচোষা প্রাণী, রক্ত শুঁকে
মাংসের স্বাদ বলে দেয়।
ঘামজলে ভেজা জিরাফ শরীর, মহাসড়কের ধুলো—
আর প্রসন্ন রমণীরা চুম্বন-শুশ্রূষা পরখ করে,
উপেক্ষার করাতকলের মতো
বুক ফেরে দেয়।


মাছ বাজারে সাম্রাজ্যবাদ
মাছ বাজারের ঝাঁঝা গন্ধে দাঁড়িয়ে
আমি মাছের খেলা দেখি
সে কত রকম মাছ…
তাকিয়ে থাকি
থলের ভিতর মাছ পুড়তে দেখে
কারো চোখ থেকে তৃপ্তির হাসি গড়িয়ে পড়ে
কারো কারো চোখ হেরে যায়
নির্লজ্জ অভাবের কাছে!

সাম্রাজ্যবাদ আজ অন্ধদের দখলে
মাছ এখানে নির্বোধ প্রজা
তাপের আঁচে নিজেকে নিঃশেষ করতে
মুখিয়ে আছে…

নৈঃশব্দ্য অঞ্জলি
সময়ের সাথে এই হেঁটে যাওয়া,
হাঁটতে হাঁটতে সামনে অসম দৌড়।
কয়লাখনির মতো ঘন অন্ধকার।
পুড়লেই জন্ম নেয় আলো—
অন্তর্গত আগুনের গোপন উৎসব।
জ্বালানির রসদ ঘন নীল দুঃখ,
নিঃশব্দ্য শিখা ফুল নয়—দগ্ধতার নিবেদন।
হৃদয় এক অপূর্ণ বৃক্ষ,
ছাইয়ের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকে—
শিরায় শিরায় সবুজের নীরব সঞ্চার,
অপেক্ষা শুধু আলোর… 


চিরন্তন সন্ধে-শোক
আয়না ভাঙে—
আয়নার ভেতর ভেতর সরু সন্তরণে    
হেঁটে যায় সময়।    
আমাদের মুখ-অবয়বে    
সুন্দরের পালক খসে পড়ে,    
পৃথিবীর আস্তরণ বলি রেখের চড় জাগে!    
 
আমরা হারাতে থাকি— স্বপ্ন ভাঙে।    
তবুও, ভিখারির মতো    
মৃত্যুর কাছে চেয়ে নেই সময়।


আলোর দহনলিপি
তোমাদের অন্ধকার পেরোতে দেখে
আমি যে আলোর বাৎসল্য কুড়িয়েছি,
তা আমায় দহন-গরদে পুড়িয়েছে অজস্রবার—
আমি গলে যেতে দেখেছি নিখুঁত সোনা,
রাজমুকুট, হীরকখণ্ড।

ময়ূরপঙ্খ বিলাপ শুনতে শুনতে দেখেছি,
ঘুঙুরজোয়ারে ভিজেছে চন্দ্রমুখী।
জলবৈভবে ভাঙাচোরা শাদা বকের ঠোঁটে
রাত্রির নক্ষত্রমৃত্যু।
তোমরা আর একটু এগুলে— আলো হবে সবুজ,
আমার দেখা হবে নরককঙ্কাল।
Previous Post Next Post