নির্বাক জোছনা •ছোটগল্প • অনন্য কাওছার

নির্বাক জোছনা
অনন্য কাওছার



আমি নিলয় ফুরকান। একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকুরী করি। এরপর যেটুকু সময় পাই টুকটাক লিখি। বইটই হাতেগোনা কয়েকটি আছে। সেরকম জনপ্রিয়তা নেই। আজকাল লেখালেখি জনপ্রিয়তা নির্ভর হয়ে গেছে। পাঠকপ্রিয়তা না থাকলে আপনি কিছুই নন। এমনটাই ঘটে চলেছে। 'লেখালেখি ভাত দেয় না, এমন কিছু করো যেটি ভাত আর জীবনের নিশ্চয়তা দেবে। এভাবে চললে এই বাড়িটাও ছাড়তে হবে। আর কত পরিবারের ঘাড়ে বসে খাবে।' এইকথাগুলো প্রতিনিয়তই শোনতে হয়। ভেবে দেখেছি আমার টুকটাক লেখালেখি নিয়ে কারো কোনো আগ্রহ নেই। ভালো লাগাটা তো আর বিসর্জন দিতে পারি না। তাই প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকুরী করছি। মাইনে বেশ একটা পাই না। অবশিষ্ট যেটুকু সময় পাই লেখালেখি করি। এ লেখালেখির সুবাদে মেহরিনের সঙ্গে পরিচয়।  অনেকদিন তার সঙ্গে দেখা নেই। মানুষটি হঠাৎ উধাও হয়ে গেল। যতদূর বুঝেছি আমার উপর অভিযোগটা ছিল এই- আমি নাকি ভীষণ ব্যস্ত মানুষ। কলটা রিসিভ করার সময় পাই না। অবহেলায় ফেলে রাখি। অবশ্য, তার অভিযোগও ফেলে দেওয়ার মত না। ডিউটি শেষে যেটুকু সময় পাই বেশিরভাগ সময়টা লেখালেখিতে কাটে। এরকম অভিযোগ আমার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব থেকেও পেয়েছি। আমি হয়তো এমনই। যাকগে! আমার জীবন থেকে উধাও হয়ে গেল মেহরিন।    নানাভাবে তাকে খুঁজেছিলাম। পাইনি। বাসাটাও ছিল অতিদূর। চট্টগ্রাম। আমার পক্ষে তখন ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম পৌঁছানো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে তারপর যেতে হবে। টাকাপয়সারও তো ব্যাপার আছেই। আমার জীবনে মেহরিন কে? সম্পর্কটা কেমন এখনও বুঝতে পারছি না। বড়োজোর ভালো বন্ধু বলা চলে। এরচেয়ে বেশিকিছু হলেও উভয়ের মধ্যে তা উন্মোক্ত হয়নি।
    আজকাল মেহরিনের কথা মনে পড়ে। কেমন যেন খারাপ লাগা কাজ করে। লেখালেখিতেও মন বসাতে পারি না। কিছু লিখতে গেলে ঘুরেফিরে প্রেম, বিরহ, এইসব শব্দাবলি আমার কলম থেকে বেরোয়৷ আমি তো প্রেমের সান্নিধ্য পাইনি, আগে কখনও প্রেম সম্পর্কীয় কিছু লিখিনি। সবসময় গ্রামীণ জনমানুষের চড়াই-উতরাই নিয়ে ছোটগল্প লিখতাম। প্রবন্ধও লিখতাম জনকল্যাণমুখী। অথচ আজকাল আমার কলম থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে প্রেম। বিষয়টি মোটেই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। আমি সর্বত্র মেহরিনের সন্ধান করেছি। অনলাইন প্লাটফর্মের কোথাও সে অ্যাকটিভ নেই। প্রতিদিনই কল করে যাচ্ছি। অথচ মোবাইলের সুইচ অফ। চট্টগ্রাম পৌঁছানো ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছি না। তবুও ডাকঠিকানায় একাধিক চিঠি পাঠিয়েছিলাম। এ যুগে এসে ডাকযোগ?
     ডাকযোগে পাঠানো চিঠিপত্র মেহরিনের কাছে পৌঁছেনি। হয়তো মাঝপথেই আটকে গেছে। কেউ হয়তো ছিঁড়ে ঝালমুড়ি খেতে এখন ব্যবহার করছে। অথবা কোনো পথচারীর পায়ের তলায় পিষ্ট হচ্ছে। এছাড়া আর কিছু মাথায় এলো না। আমি কয়েকদিন যাবত কিছুই লিখতে পারছি না। ঠিকঠাক অফিস করাটাও বিরক্তিকর বলে মনে হচ্ছে। মাথাটা ভীষণ একগুঁয়ে হয়ে গেছে। গল্পের অনবদ্য প্লটের অভাবে আজকাল লিখতেও বসি না। মনে হচ্ছে বাইরে কোথাও  ঘুরতে যাওয়া দরকার। যান্ত্রিক পরিবেশ থেকে কিছুটা দূরে কোথাও। মনটা ভালো করার এটাই মহৌষধ। হয়তো মেহরিনকেও বিস্মৃতির গুদামে বন্দী করা যাবে।
    অথচ আমি বেরোতে পারিনি। মায়ের কল পেয়ে বাড়ি ফিরতে হলো। আমার জন্য নাকি বিবাহের পাত্রী দেখা হচ্ছে। এই বুঝি আরেকটি মুশকিলে পড়লাম। উফ! আজ যদি মেহরিনের সঙ্গে যোগাযোগ হতো, কী যে ভালো হতো। এ সুযোগটা কাজে লাগাতে পারতাম।  এইযে আমার কথার মধ্যে মেহরিন চলে আসে।  টেলিভিশনের পর্দায় তার উপস্থিতি, গল্পের ভেতরেও মেহরিনের হুটহাট আগমন। আজকাল মেহরিনের কারণে চাকুরিটাও হারাতে বসেছি। লেখালেখিটা তো আর হচ্ছে না। মায়ের কথামতো বাড়ি চলে এলাম। বুঝানোর চেষ্টা করেছি যে আরো ভালো একটা চাকুরী হোক। তারপর ভেবে দেখব। আপাতত এটুকুই।
    সন্ধ্যা পর্যন্ত টেবিলে বসেছিলাম। শত প্রয়াস চালিয়ে একটি গল্প লিখতে পারিনি। মনটা ভালো লাগছে না। এরইমধ্যে আরিফের কল বেজে উঠলো। এতদিন পর কী মনে করে কলটা দিয়েছে জানি না। দেরি না করে কলটা রিসিভ করলাম। আরিফ বলল, 'কী-রে! জাতীয় পত্রিকা আজকাল পড়া হয় না? তোর একটি গল্প ছাপা হয়েছে দেখলাম।' ইদানীং পত্রিকা পড়া হয়না ঠিক। মেহরিন আর চাকুরীর মধ্যে পড়ে আছি। কিছুই করা হচ্ছে না। এরইমধ্যে আরিফ জানিয়েছে, তার মামাতো ভাইয়ের সহপাঠী সাগরের থেকে একটি ইনভাইটেশন আছে আগামী সপ্তাহে। সাগর আমার এতোটা পরিচিত না। আরিফের সঙ্গে গাঢ়তর বন্ধুত্ব, চলাফেরা। আমি ইতস্তত বোধ করলাম। যদিও সে জানে না মেহরিনের বাসাবাড়ি। নামঠিকানা। তবুও না করে দিলাম। আমি জানি কাজটা ঠিক করিনি। এ সুযোগে চট্টগ্রাম পৌঁছানো যায়। পরক্ষণেই আরিফকে জানিয়ে দিলাম আমি যেতে আগ্রহী। ইনভাইটেশন অ্যাকসেপ্টেড।
    আমরা ঠিকঠাক  পৌঁছে গেলাম। মনের মধ্যে বেশ আনন্দ লাগছিল। আরিফদের পোগ্রামটা শেষ করে ভেবেছিলাম মেহরিনের ঠিকানায় পৌঁছোব। তা আর হয়ে উঠেনি। আমার সামনেই মেহরিন। বিয়ের চূড়ান্ত আয়োজন। সাগরের সামনে বসে আছে তার হবু-স্ত্রী মেহরিন। নির্বাক জোছনা খসে পড়তে লাগলো আমার চোখ হয়ে শরীরে। 

• জাতীয় দৈনিক খোলা কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত গল্প। 



Previous Post Next Post